নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:২৩, ১১ জুন ২০২৬

৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল

৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল

ফাইল ছবি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে গত ২৭ মে ভোরে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির লাইসেন্স বাতিল ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন ভোরে, যখন মগবাজারের ওই হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ছয় নবজাতক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একে একে মৃত্যুবরণ করে। মৃত শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিনের মধ্যে, যাদের অনেকের নামও রাখা সম্ভব হয়নি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ৪ জুন তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসে। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, যে ওয়ার্ডটিতে নবজাতক ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের রাখা হয়েছিল, তা চিকিৎসার জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের অভাব ছিল, এসি ব্যবস্থা ছিল অকার্যকর ও অনিয়মিত এবং বিকল্প ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না। 

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে যে, ঘটনার সময় ওই ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার অনেক বেশি প্রায় ৫০ জন মানুষের উপস্থিতি ছিল। এর ফলে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা নবজাতকগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ইস্যুতে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নবজাতকগুলোর শারীরিক অবস্থা জন্মের পর সুস্থ থাকলেও ঘটনার সময় ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসকের উপস্থিতি ছিল না এবং গুরুতর অবস্থায়ও সময়মতো জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়নি। দায়িত্বরত সেবিকাদের চরম অবহেলা ও সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্সের অভাবই শিশুদের মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করেছে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করে। নোটিশে জানতে চাওয়া হয়, কেন আইন লঙ্ঘনের দায়ে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে ৭ জুন পর্যন্ত জবাব দেওয়ার সময় পেলেও পরবর্তীতে আবেদনের প্রেক্ষিতে সময়সীমা ৯ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রদান করা জবাব ও ব্যাখ্যা অধিদপ্তরের কাছে ‘সন্তোষজনক’ বলে বিবেচিত হয়নি, যার ফলে লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত আদেশ দেওয়া হয়।

লাইসেন্স বাতিলের ফলে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের নিরাপত্তা ও স্থানান্তর প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালে কোনো রোগীর চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন চিকিৎসাধীন রোগীদের নিকটতম উপযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কোনো রোগী বা তাদের স্বজনদের সহায়তার প্রয়োজন হলে তা অধিদপ্তরকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। 

এদিকে, লাইসেন্স বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১২ ধারা অনুযায়ী আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনার আইনি সুযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

অন্য এক প্রেক্ষাপটে, নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছিলেন যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিটি পরিবারের জন্য ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সরকার পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করে প্রতিবেদন ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে রমনা থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়