ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি বা ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই বিশাল অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (আইএমইউ) শীর্ষক ১৪ পয়েন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় উন্মোচিত হতে চলেছে, যেখানে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই হবে শান্তি স্থাপনের প্রধান চালিকাশক্তি।
এই উচ্চাভিলাষী ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ তহবিলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সম্পূর্ণ অ-সরকারি চরিত্র। এই তহবিলের সাথে কোনো প্রকার সরকারি অর্থায়নের সম্পৃক্ততা থাকবে না; বরং বিশ্বজুড়ে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এটি পরিচালিত হবে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ১৫ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ সংগৃহীত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকাভিত্তিক একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি ইরানের জ্বালানি, লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনঃনির্মাণে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে এবং অনেকেই অর্থ প্রদান শুরু করেছে।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষত পূরণে ইরান প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি সরকারি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। তবে ওয়াশিংটন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, বিকল্প উপায় হিসেবে এই বিশাল বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিলের প্রস্তাবটি সামনে আসে।
আরও পড়ুন: ‘আমার কারণেই টিকে আছে ইসরায়েল’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে ইতোমধ্যেই প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং জেনেভায় ১৯ জুনের অনুষ্ঠানটি কেবল সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মাত্র।
যদিও তহবিলের সিংহভাগ অর্থ বেসরকারি খাত থেকে আসবে, তবুও আঞ্চলিক দেশগুলো পৃথকভাবে ইরানের তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কারখানা পুনর্গঠনে সহজ শর্তে ঋণ, ক্রেডিট সুবিধা এবং সরাসরি অনুদান প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে।
এই বিনিয়োগ তহবিলের সুবিধা প্রাপ্তি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি সরাসরি ইরানের আচরণ এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো অর্থই এককালীন বা শর্তহীনভাবে ছাড় করা হবে না। ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামগ্রিক দায়িত্বশীল আচরণের বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতেই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ৯ কোটি মানুষের বাজার এবং বিশাল জ্বালানি সম্পদ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা এই তহবিলকে সফল করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির মতো কোনো ত্রুটি যাতে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন।
ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের শর্তানুযায়ী, ১৯ জুনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর দুই দেশ একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য ৬০ দিন সময় পাবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার মতো কঠিন শর্তগুলো মেনে চলতে হবে।
কূটনৈতিক মহলে এটি প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, যদি ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অটল থাকে, তবে এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর এখন জেনেভার দিকে, যেখানে ঐতিহাসিক এই শান্তি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হতে যাচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








