৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ায় ৩৪১ আফটারশক, নিহত বেড়ে ৫১
ছবি: সংগৃহীত
পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার নুসা তেংগারা প্রদেশ এবং ফ্লোরোস দ্বীপের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও এর পরবর্তী ভয়াবহ আফটারশকের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউজিএসজি) এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১৫ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৫টা বেজে ৫৮ মিনিটে ফ্লোরোস দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ২০২২ সালে পশ্চিম জাভার ভূমিকম্পের পর এটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪ থেকে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী বেঞ্জামিন পাউলুস অক্টাভিয়ানুস জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে ৩৬ জনের অবস্থা গুরুতর এবং বাকিরা সামান্য আঘাত পেয়েছেন।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা উল্লেখ করেছেন যে, বেশিরভাগ নিহতের ঘটনা ঘটেছে গভীর রাতে বা খুব সকালে মানুষ যখন ঘুমাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আকস্মিক ধসে পড়া ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে মাংগারাই, পূর্ব মাংগারাই, সিক্কা, এন্দে এবং নাগাদা অঞ্চলে।
মূল ভূকম্পনের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় ছোটখাটো সুনামিও আঘাত হানে। আবহাওয়া ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এনদার মাউরোলে প্রায় ০.৯৪ মিটার এবং এনগাদা রিজেন্সির রিউং গ্রামে ১.৬১ মিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ আছড়ে পড়ে। সুনামির তোড়ে এবং জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় বহু গ্রামের কাঁচা ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোতে পলি জমে যায়, তীরে আটকা পড়ে মাছ ধরার নৌকা। আকস্মিক এই ধাক্কায় ফ্লোরোস দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ উচ্চভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন।
আরও পড়ুন: আবার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল ইন্দোনেশিয়ায়
ভূমিকম্পের পর দুই শতাধিক বা প্রায় সাড়ে তিনশতাধিক (বিভিন্ন সংস্থার মতে ৩৪১ থেকে পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট বড় মিলিয়ে বহু) আফটারশক অনুভূত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় আফটারশকটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২। ক্রমাগত পরাঘাত এবং বড় ধরনের ভূমিধসের কারণে এন্দেকে মাউমেরের সঙ্গে সংযোগকারী প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক ট্রান্স-ফ্লোরোস হাইওয়েসহ বেশ কিছু অঞ্চলের মূল সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এর ফলে দুর্গম পাহাড়ি ও বরখাস্ত এলাকাগুলোতে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ চালাতে মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, ফ্লোরোস দ্বীপের বিভিন্ন জনপদে এক হাজার তিনশতের অধিক বাড়িঘর ও প্রায় শতাধিক জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যার মধ্যে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গির্জা ও বেশ কিছু সরকারি অফিস ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিক্কা অঞ্চলের অনেক বাসিন্দা ও মাউমেরে শহরের হাসপাতালের বাইরে রোগীরা খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টাঙিয়ে অস্থায়ী তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেরতামিনার অন্তত ২০টি পেট্রল স্টেশন এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে ৩ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল (বাসার্নাস) মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও লজিস্টিক পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ও বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অনেক দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রাম ভূমিধসে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে থাকায় এবং ভারী যন্ত্রপাতির সংকটে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় পূর্ব নুসা তেংগারা প্রাদেশিক সরকার প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে দ্রুত সরকারি তহবিল বরাদ্দ এবং উদ্ধার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে জানিয়েছে বিএনপিবি। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালেও এই একই অঞ্চলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ২৯ কোটি জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অব ফায়ার-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক ভূমিকম্পপ্রবণ ও আগ্নেয়গিরি বহুল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








