স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা আমদানিতে নতুন নীতিমালা
ফাইল ছবি
দেশের আমদানি বাণিজ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ১৩ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমদানি-সংক্রান্ত সব বিধিবিধান একীভূত করে একটি সমন্বিত নীতিমালা জারি করেছে। মূলত গত এক বছরে আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ে জারি করা বিচ্ছিন্ন নির্দেশনাগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা ব্যাংক ও আমদানিকারকদের জন্য আলাদা আলাদা প্রজ্ঞাপন খোঁজার বিড়ম্বনা দূর করবে।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এই সমন্বিত নির্দেশনাটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে নতুন কোনো নির্দেশনা জারি হলে তা এই নতুন সার্কুলারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
নতুন এই কাঠামোয় আমদানি বাণিজ্যের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া, অনুমোদিত পরিশোধ পদ্ধতি, অগ্রিম অর্থ প্রেরণ, বিল অব এন্ট্রি দাখিল, সরবরাহকারী ও ক্রেতার ঋণ সুবিধা এবং আমদানি দায় পরিশোধের বিস্তারিত নিয়মাবলি। এছাড়া রপ্তানিকারকদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বৈদেশিক মুদ্রায় অভ্যন্তরীণ এলসি, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের আমদানি বিধি এবং স্বর্ণ, রুপা, গহনা ও বৈদেশিক মুদ্রার নোট আমদানির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোও এই নতুন নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নীতিমালাটিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমদানি ডকুমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রচলিত ব্যাংক ঋণের বাইরে বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও বাড়লো সোনার দাম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় অনলাইন রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে। এখন থেকে সব অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে তাদের আমদানির তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন আমদানি মনিটরিং সিস্টেমে (OIMS) নিয়মিত রিপোর্ট করতে হবে, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে, ৩ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়ে বড় অংকের আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে ওআইএমএসে রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, আমদানিকৃত পণ্যের সঠিক বিবরণ, মান, ব্র্যান্ড, ইউনিট প্রাইস এবং আট ডিজিটের এইচএস কোড নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এটি লক্ষণীয় যে, এই সমন্বিত সার্কুলারটি মূলত বিদ্যমান নিয়মের একটি হালনাগাদ সংস্করণ, কোনো নতুন বিধিনিষেধ বা বিশেষ সুবিধা নয়; ফলে আমদানি রিপোর্টিং-সংক্রান্ত আগের নিয়মগুলো একইভাবে বহাল থাকবে।
ব্যবসায়ী মহল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সব নির্দেশনা এক ছাতার নিচে আসায় আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সময় সাশ্রয় হবে। তবে উদ্যোক্তারা সতর্ক করেছেন যে, কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না, বরং এর সুফল পেতে হলে ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন অনলাইন অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের নতুন নিয়মের ওপর যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একইসাথে, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে সম্প্রতি শিথিল করা নতুন নিয়মাবলী (ইন্টারকোম্পানি লেনদেন) এবং সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স বজায় রাখার ওপরও ব্যবসায়ীদের বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সামগ্রিকভাবে, এই নতুন কাঠামোটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে গতিশীলতা আনার পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যের সঠিক মূল্য ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণে একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








