তালেবানের ৫ বছর: আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ও গভীর সংকট
ছবি: সংগৃহীত
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের পতন ঘটিয়ে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল তালেবান। সদ্য বিদায়ী সপ্তাহে ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে কট্টরপন্থি এই গোষ্ঠীটি। কাবুলে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে সাঁজোয়া যান নিয়ে কুচকাওয়াজ ও ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমে দিনটিকে পশ্চিমা আধিপত্য থেকে নিজেদের বিজয় দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তালেবান সরকার।
গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কোনো বিদেশি সেনা যেমন নেই, তেমনি তালেবানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সশস্ত্র বিরোধিতাও গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে সামরিক ও প্রশাসনিকভাবে গোষ্ঠীটি দেশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিনিময়ে আফগানিস্তান পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও দমনমূলক এক রাষ্ট্রে, যেখানে মানবিক ও প্রাকৃতিক সংকট প্রতিনিয়তই আরও গভীর হচ্ছে।
তালেবানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা চরমভাবে কেন্দ্রীভূত। কান্দাহার থেকে রাষ্ট্রের বড় রাজনৈতিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।
অন্যদিকে, কাবুলে দৈনন্দিন প্রশাসন, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মোল্লা আবদুল গনি বারাদার, সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, মাওলভি ইয়াকুব ও আমির খান মুত্তাকির মতো শীর্ষ নেতারা।
তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি এক ভিডিও বার্তায় নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পেছনে মনোবল, সাহস ও সৃষ্টিকর্তার সহায়তার কথা উল্লেখ করলেও, বিরল এক স্বীকারোক্তিতে এখনো কিছু সমস্যা ও জটিলতা রয়ে গেছে বলে মেনে নিয়েছেন। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গোষ্ঠীটি কেবল সামরিক শক্তির ওপরই নির্ভর করছে না; বরং পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক সুবিধা এবং প্রায় ১৫ হাজার নিবন্ধিত মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভাতা প্রদানের মাধ্যমে একটি অনুগত প্রশাসনিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে।
তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার জায়গাটি হলো অর্থনীতি। ক্ষমতা দখলের পর আন্তর্জাতিক অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটকে দেওয়ায় আফগানিস্তানের অর্থনীতি দ্রুত ধসে পড়ে। রাতারাতি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং লাখ লাখ মানুষ কাজ হারান।
যদিও তালেবান সরকার শুল্ক ও খনিজ রয়্যালটি থেকে রাজস্ব আদায় বাড়িয়েছে, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
ইউএনডিপির তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আফগান অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়লেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। আফগানিস্তানের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ এখনো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (আইআরসি) মতে, ২০২১ সালের তুলনায় বর্তমানে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এমন আফগানের সংখ্যা ৩৫ লাখ বেড়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ আফগান নাগরিক মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূমিকম্প এবং ইরান ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিককে ফেরত পাঠানোর কারণে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
আরও পড়ুন: ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানোর ঘোষণা মিয়ানমারের
শিশুদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক; সেভ দ্য চিলড্রেনের নতুন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ লাখ শিশু চরম অপুষ্টির শিকার, যা প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে একজনের সমান।
তালেবান শাসনের সবচেয়ে সমালোচিত দিক হলো নারীদের ওপর আরোপিত নজিরবিহীন কঠোর বিধিনিষেধ।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫ লাখ আফগান নারী ও কিশোরীকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন জানিয়েছে, বর্তমানে আফগানিস্তানের অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দুইবার বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পান।
আফগানিস্তানের সাবেক সংসদ সদস্য ফাওজিয়া কুফির মতে, তালেবানের অধীনে নারীরা খাঁচায় বন্দি পাখির চেয়েও পরাধীন জীবনযাপন করছেন, যেখানে তাদের নূন্যতম মানবাধিকারটুকুও নেই। নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার কারণে আফগানিস্তানের বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। এসব নিপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ও প্রধান বিচারপতি আবদুল হাকিম হাক্কানির বিরুদ্ধে গোপন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। নারী অধিকার ছাড়াও শিয়া ও হাজারা জনগোষ্ঠীর মতো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরাও চরম বঞ্চনা ও দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। শিয়া মতবাদের শিক্ষা ও আইনি স্বীকৃতি সংকুচিত করা হয়েছে এবং সালাফি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে তালেবান সরকার এখনো স্বীকৃতিহীন ও বিচ্ছিন্ন হলেও কিছু আঞ্চলিক শক্তি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল রাশিয়া তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিলেও, চীন, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো কাবুলের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, বিভিন্ন দেশের এই আলাদা যোগাযোগের কারণে তালেবানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর বৈশ্বিক চাপ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে একসময় তালেবানের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পাকিস্তান ২০২৩ সালের পর থেকে প্রায় ২৬ লাখ আফগানকে ফেরত পাঠিয়েছে এবং আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলাও চালিয়েছে। গোষ্ঠীটির কট্টরপন্থি অংশ টিটিপির সদস্যদের ঐতিহাসিক মিত্র হিসেবে দেখায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া তালেবানের ভেতরেও রাজনৈতিকভাবে কঠিন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। একদিকে কাবুলের ২৮ বছর বয়সী দোকান মালিক নাজিবুল্লাহ ঘোরজাং বিশ্বাস করেন তারা বড় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছেন এবং দেশটি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে, ইরান থেকে বিতাড়িত হওয়া মেকআপ আর্টিস্ট ফাতিমার মতো লাখো নারী প্রতিদিন নিজেদের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যানন যথার্থই বলেছেন, টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য শুধু সংঘাতের অনুপস্থিতিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সব আফগানের অধিকার ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ। নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থানহীনতা এবং কঠোর আদর্শিক শাসনের কারণে আফগানিস্তান যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, তা থেকে উত্তরণের পথ তালেবানের জন্য আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








