রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের নতুন বার্তা
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করা প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার (নির্দিষ্ট করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৭৫ জন) রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে মিয়ানমার।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ রাখাইন অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে এলে যাচাইকৃত এসব বাস্তুচ্যুত মানুষকে ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার বিপরীতে গত জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৭৫ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে রাখাইনের বৈধ সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা গেছে।
তবে একই সঙ্গে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, তালিকার মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সঠিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দীর্ঘ ও স্থবির প্রক্রিয়ায় এই স্বীকৃতিকে একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনও নানা সংশয় রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানোর ঘোষণা মিয়ানমারের
এর আগেও দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথভাবে একাধিকবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু রাখাইনে নিরাপত্তা ঘাটতি, নাগরিকত্ব প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা না থাকায় বড় পরিসরে কোনো রোহিঙ্গার জনস্রোত স্বদেশে ফিরে যায়নি। বিশেষ করে গত কয়েকমাস ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং রাখাইনের বড় প্রাচীর দখলকারী শক্তিশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যকার তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত গোটা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও ঘোলাটে করে তুলেছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বৈষম্য এবং দীর্ঘমেকানিকাল রাষ্ট্রহীনতার শিকার এই মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর সামরিক দমন-পীড়ন, অগ্নিসংযোগ ও পাইকারি সহিংসতার মুখে রাখাইন থেকে জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজার ও উখিয়া-টেকনাফের জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে ১৩ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর বাইরেও বহু রোহিঙ্গা জীবনের চরম ঝুঁকি ঘাড়ে নিয়ে সমুদ্রপথে নৌকায় চড়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন।
বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার পরিষ্কার করা হয়েছে যে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও টেকসই হতে হবে।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের ভেতরে পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ, বসতভিটার নিরাপত্তা এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুনির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা না পেলে রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি নন সাধারণ রোহিঙ্গারা। ফলে মিয়ানমার সরকার সাবেক বাসিন্দা হিসেবে প্রাথমিক স্বীকৃতি দিলেও, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই বৃহৎ মানবিক সংকটের কোনো দৃশ্যমান বা টেকসই সমাধান দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








