অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়
ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করেছে টাইগাররা। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাওহীদ হৃদয়ের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই তিন ম্যাচের সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিকরা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অনুষ্ঠিত ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া প্রথমে ব্যাট করে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে সংগ্রহ করে ১৮৭ রান। এরপর বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হলে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান। চাপের মুহূর্তে ব্যাটারদের ধৈর্য ও বোলারদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে সেই লক্ষ্য ৩৬ বল হাতে রেখেই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।
এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় জয়। এর আগে একমাত্র জয়টি এসেছিল ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের কার্ডিফে। দীর্ঘ ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে আবারও ওয়ানডেতে হারানোর পর এবার তাদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে মিরপুরের উইকেটে শুরুটা তাদের জন্য হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্নের মতো। নতুন বলে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের আগুন ঝরানো বোলিংয়ে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই তিন উইকেট হারায় সফরকারীরা।
ইনিংসের তৃতীয় বলেই তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত ইনসুইংয়ে বোল্ড হন ম্যাথু শর্ট। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান পরপর দুই উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধাক্কা দেন। কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে দেন তিনি। দুই উইকেটেই গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ নেন উইকেটরক্ষক লিটন দাস।
অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই তিন উইকেট হারানোর ঘটনা তাদের ওয়ানডে ইতিহাসে বিরল। ১০২৪ ওয়ানডে ম্যাচের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর বিব্রতকর রেকর্ড গড়ে অস্ট্রেলিয়া।
এরপর অ্যালেক্স ক্যারি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৭ বলে ১৩ রান করে মোস্তাফিজের বলে শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তিনি। ২৫ রানে চতুর্থ উইকেট হারিয়ে আরও বিপদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জশ ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তরুণ স্পিনার তানভীর ইসলামের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে দুজনই বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ইংলিস ৩৪ রান এবং গ্রিন ২৫ রান করে আউট হন।
৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। সেই জায়গা থেকে দলকে ঘুরে দাঁড় করান মার্নাস লাবুশেন ও জাভিয়ের বার্টলেট। সপ্তম উইকেটে দুজন মিলে ১০৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে লড়াই করার মতো অবস্থানে নিয়ে যান।
বার্টলেট ৪৮ বলে ৪টি চার ও ২টি ছক্কায় ৫২ রান করেন। লাবুশেন অপরাজিত থাকেন ৫৫ রানে। তবে শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের জোড়া আঘাতে আবারও চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। বার্টলেটকে বোল্ড করার পর পরের বলেই অ্যাডাম জাম্পাকে ফিরিয়ে দেন তিনি।
আরও পড়ুন: ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারালো বাংলাদেশ
শেষ পর্যন্ত ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান সংগ্রহ করে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের হয়ে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তিনটি করে উইকেট নেন। তানভীর ইসলাম শিকার করেন দুটি উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় বৃষ্টি। দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকার পর মাঠে ফিরলেও অস্ট্রেলিয়া আর ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ পায়নি। ফলে ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
লক্ষ্য খুব বড় না হলেও শুরুটা বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তিদায়ক ছিল না। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তানজিদ হাসান তামিম ফিরে যান। জাভিয়ের বার্টলেটের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন তিনি।
এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকার দলকে বিপদ থেকে বের করে আনেন। দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে জয়ের ভিত তৈরি করেন তারা। দীর্ঘদিন পর একাদশে সুযোগ পাওয়া সৌম্য ছিলেন আক্রমণাত্মক, আর শান্ত খেলেন নিয়ন্ত্রিত ইনিংস।
তবে দুজনই হাফ সেঞ্চুরি থেকে বঞ্চিত হন। রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে সৌম্য সরকার ৪৭ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় ৪২ রান করে আউট হন। এরপর শান্তও ৫৩ বলে ৫টি চারের সাহায্যে ৪২ রান করে ফিরে যান।
এই ইনিংসে শান্ত ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দুই হাজার রান পূর্ণ করেন। বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম ব্যাটারদের তালিকায় তিনি জায়গা করে নেন।
শান্ত-সৌম্য ফেরার পর কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। লিটন দাস ২১ রান করে আউট হন। এরপর প্রথম ওয়ানডের ম্যাচসেরা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও ১৫ রানের বেশি করতে পারেননি। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় ম্যাচ।
তবে সেখান থেকে দলের হাল ধরেন তাওহীদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ষষ্ঠ উইকেটে ৫১ রানের অপরাজিত জুটি গড়ে তারা দলকে জয় এনে দেন।
হৃদয় ছিলেন শেষ পর্যন্ত অপরাজিত। ৯৫ বলে ৪০ রানের ধৈর্যশীল ইনিংস খেলেন তিনি। মিরাজ খেলেন দ্রুতগতির ২২ রানের ইনিংস। শেষ পর্যন্ত ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচ শেষ করেন অধিনায়ক।
বাংলাদেশ ৫ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে ৩৬ বল হাতে রেখেই।
এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি একটি বড় মাইলফলক। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রথমবার সিরিজ জিতে টাইগাররা নিজেদের ওয়ানডে সামর্থ্যের নতুন প্রমাণ দিল।
এ নিয়ে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ। এর আগে মিরপুরে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ৮৬ রানের জয় পেয়েছিল স্বাগতিকরা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের শেষ ও তৃতীয় ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে ১৪ জুন, মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামেই।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








