ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সুখবর দিলেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। অনলাইনভিত্তিক এই পেশাজীবীদের আয়ের ওপর প্রস্তাবিত সাড়ে সাত শতাংশ (৭.৫%) ভ্যাট বা কর আরোপের যে গুঞ্জন বা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (০১ জুন) সচিবালয়ে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হওয়া দেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা ও ‘চিত্ত মিডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা জুয়েল রানার সাথে এক দীর্ঘ ও বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তরুণ সমাজকে এই আশ্বাস দেন। একই সাথে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যারা বৈধ উপায়ে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও বেশি সহায়ক ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা উচিত বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকটি শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন জুয়েল রানা।
তিনি জানান, সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটিতে চিরাচরিত রাজনীতির চেয়ে দেশের সাধারণ মানুষ, ঋতুভিত্তিক প্রকৃতি, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং তরুণ প্রজন্মের অপার সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাকে কোনো আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালে না রেখে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
সাক্ষাতের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জুয়েল রানাকে জানান যে, তিনি বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ‘চিত্ত মিডিয়া’র বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজ নিয়মিত দেখে আসছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের চিরচেনা গ্রামীণ প্রকৃতি, নদীমাতৃক রূপ, মেঠোপথ, কৃষিজীবন এবং প্রান্তিক মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রাকে যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়, তা প্রধানমন্ত্রীর মন কেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ইংল্যান্ডে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং সেই কারণে প্রকৃতির প্রতি তার একটি গভীর ও স্থায়ী টান রয়েছে। বর্তমান ব্যস্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মাঝেও একটু সময় পেলেই তিনি এই ধরনের প্রকৃতিনির্ভর কনটেন্ট দেখেন, যেখানে দৃশ্যপটের পাশাপাশি সমৃদ্ধ সাহিত্য, কবিতা ও বিভিন্ন মননশীল উদ্ধৃতির চমৎকার ব্যবহার তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
বৈঠকের একপর্যায়ে দেশের তরুণদের একটি বড় অংশের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ানো কর সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। জুয়েল রানা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান যে, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ৭.৫% কর বা ভ্যাট আরোপের যে খবরটি চারদিকে ছড়িয়েছে, তা কতটুকু সত্য।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দেশের লাখো তরুণ এখন ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ভিডিও নির্মাণের মতো স্বাধীন পেশার মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এনে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। এই বিকাশমান খাতে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপালে তরুণদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হতে পারে এবং তারা কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। জুয়েল রানার এই বক্তব্য শোনার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজের কক্ষে ডেকে পাঠান এবং পুরো বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা জানতে চেয়ে খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
একই সাথে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তরুণদের আয়ের ওপর এমন কোনো নেতিবাচক করের বোঝা চাপানো যাবে না যা তাদের পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ফ্রিল্যান্সারদের অবদানের কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী জুয়েল রানাকে বলেন, এরকম কিছু হইতে দেওয়া যাবে না। আমি চাই যে ইয়াংরা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে যাক, তারা বৈদেশিক বিভিন্ন কাজে ইনভলব থাকুক। তারা বাইরের অর্থ দেশে নিয়ে আসছে, দ্যাটস এনাফ (এটাই যথেষ্ট)। ফ্রিল্যান্সার যারা আছে তারা দেশের জন্য অনেক বড় ভূমিকা রাখে। যারা কন্টেন্ট ক্রিয়েশন করে তারা তাদের ফ্যামিলি চালায়। এটা (কর আরোপ) হতে পারে না। তারা দেশের টাকা পাচার করে না, বরং দেশে আনে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জুয়েল রানা আরও যোগ করেন যে, ফ্রিল্যান্সাররা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছেন, তাই তাদের প্রতি সরকারের সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর যুক্তিটির সাথে শতভাগ একমত পোষণ করে জুয়েল রানাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, অবশ্যই, আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন। এরকম কিছু হবে না, নিশ্চিন্তে থাকুন। কন্টেন্ট ক্রিয়েশন যারা করছেন এবং ফ্রিল্যান্সার যারা আছেন, তাদের জন্য এরকম কোনো ঘটনা ঘটবে না ইনশাআল্লাহ। নো টেনশন, আপনারা কাজ করে যান। প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় বার্তা দেশের আইটি সেক্টর ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কর সংক্রান্ত আলোচনার বাইরেও এই বৈঠকে নাগরিক দায়িত্ব ও দেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়। জুয়েল রানা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সমাজ থেকে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ হ্রাস পাচ্ছে। দেশের যেকোনো প্রান্তের দুর্ঘটনা বা কোনো অসহায় মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানোর চেয়ে অনেকে মোবাইল বের করে ভিডিও ধারণ করতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মনন, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, কোনো শিশু যদি গাছ থেকে লিচু পাড়ে, তাকে মারধর না করে ভালোবাসা দিয়ে বোঝানো উচিত, পাশাপাশি প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতিও মানুষের সহমর্মিতা বাড়ানো দরকার। প্রধানমন্ত্রী জুয়েল রানার এই মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক পরিবর্তনের ধারণাকে সাধুবাদ জানান এবং তাকে তার এই সচেতনতামূলক কাজ ও শিল্প-সাহিত্যের মেলবন্ধনে কনটেন্ট তৈরির ধারাটি অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন, যা নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সাথে যুক্ত রাখবে।
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে জুয়েল রানার কোনো চাওয়া-পাওয়া বা সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে তা নাকচ করে দেন। জুয়েল রানা জানান, দেশের সব নাগরিকের জন্য যা কল্যাণকর হবে, সেটাই তার জন্য যথেষ্ট এবং ব্যক্তিগত কোনো সুবিধার পেছনে তিনি ছুটছেন না। দেশের মানুষ ভালো থাকলেই তিনি ভালো থাকবেন এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা ও সমাজকে বিভ্রান্তি থেকে দূরে রাখাই তার মূল লক্ষ্য। উল্লেখ্য, কৃষি, প্রকৃতি ও সাহিত্যের সমন্বয়ে অনন্য কনটেন্ট তৈরি করে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা ‘চিত্ত মিডিয়া’ পেজটি মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে ৪৩ লাখেরও বেশি অনুসারী (ফলোয়ার) অর্জন করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে এবং এই অনন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে সচিবালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে জুয়েল রানার মাধ্যমে উঠে আসা এই কর বা ভ্যাট মওকুফের আশ্বাসের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা দাপ্তরিক ঘোষণা প্রকাশ করা হয়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








