আদাবরে চালক অপহরণ ও নির্যাতন, মূলহোতাসহ গ্রেফতার ৫
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর আদাবর থানা এলাকায় এক পেশাদার গাড়িচালককে সুপরিকল্পিতভাবে অপহরণ, নির্জন রিকশা গ্যারেজে আটকে রেখে বর্বর নির্যাতন এবং পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ দল তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অপহৃত যুবককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই নৃশংস অপহরণের ঘটনার নেপথ্যে ভুক্তভোগীর আপন বড় ভাইয়ের পারিবারিক কলহ ও গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা এবং আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর মঙ্গলবার (০৯ জুন) বিকেলে এই সুনির্দিষ্ট তথ্য ও গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী যুবকের নাম মো. সজিব (২৬)। তিনি পেশায় একজন ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং বর্তমানে মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় বসবাস করছেন, তবে তার আদি পৈতৃক নিবাস ভোলার লালমোহন উপজেলায়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, পূর্বপরিচিত জয়নাল নামের এক ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট ফাঁদে পড়ে গত ৮ জুন (সোমবার) রাত আনুমানিক ৮টা ১৫ মিনিটে সজিব আদাবর বাজার এলাকায় যান। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ৮ থেকে ৯ জনের একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র অপরাধী দল সজিবকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিকভাবে মারধর শুরু করে। পরবর্তীতে তাকে মুখে কাপড় বেঁধে আদাবর এলাকার বিভিন্ন গোপন স্থানে নিয়ে গিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে অপরাধীরা তাকে আদাবর ১৩ নম্বর রোডের শেলটেক কোম্পানির একটি বহুতল ভবনের পাশে অবস্থিত পরিত্যক্ত রিকশা গ্যারেজের অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখে।
আরও পড়ুন: রাজধানীর মৌচাকে বিএনপি নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
সজিবকে সম্পূর্ণ জিম্মি করার পর অপহরণকারীরা তার পরিবারের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং সজিবের মুঠোফোন ব্যবহার করেই তার বোন মোসা. জিতু আক্তারের কাছে কল করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অন্যথায় সজিবকে হত্যা করে লাশ গুম করার সরাসরি হুমকি প্রদান করা হয়। শুধু মুক্তিপণ দাবিই নয়, জিম্মি থাকাকালীন সময়ে সজিবের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তার সাথে থাকা একটি মূল্যবান স্মার্টফোন, একটি রুপার চেইন এবং পকেটে থাকা নগদ ৪৭০ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় অপরাধীরা। একপর্যায়ে কৌশলে সজিব তার বোন জিতুকে মুঠোফোনে নিজের বন্দিদশা ও সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কথা সংক্ষেপে জানাতে সক্ষম হন। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে বোন জিতু আক্তার অবিলম্বে আদাবর থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস ও বিশেষ আভিযানিক দল তাৎক্ষণিকভাবে সোমবার রাতেই ওই পরিত্যক্ত রিকশা গ্যারেজে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে অপরাধীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগী সজিবকে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই সাথে ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত এবং মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্টভাবে নাম থাকা পাঁচ আসামিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভুক্তভোগীর বোন মোসা. জিতু আক্তার বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) অপহরণ, সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি, মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মারধর, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং প্রাণনাশের ভয়ভীতি প্রদর্শন সংক্রান্ত গুরুতর বিভিন্ন ধারায় রুজু করা হয়েছে। আদাবর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহেদ আলীকে এই স্পর্শকাতর মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের অপরাধের খতিয়ান ও ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা করে পুলিশ অত্যন্ত চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করেছে।
আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, গ্রেফতারকৃত ৫ জনের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ অপরাধী হলো বাদল মিয়া। আদাবর থানার অপরাধ নথি (ক্রিমিনাল রেকর্ড) পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাদল মিয়ার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও আদাবর থানায় বিভিন্ন ধারায় পাঁচটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা দায়ের রয়েছে, যা তাকে একজন অভ্যাসগত এবং দাগী অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করে। মূলত বাদল মিয়ার এই অপরাধ চক্রটিকে ভাড়ায় খাটানো হয়েছিল সজিবকে অপহরণ ও শায়েস্তা করার জন্য।
ঘটনার মূল মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই ঘটনার পেছনে গভীর পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব কাজ করছে। মূলত ভুক্তভোগী সজিবের আপন বড় ভাই এবং তার স্ত্রীর (ভাবী) মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ চলছিল। পুলিশের জোরালো ধারণা, এই পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই সজিবকে শিক্ষা দিতে কিংবা প্রতিশোধ নিতে তার আপন বড় ভাই নিজেই এই অপহরণকারী চক্রের সাথে যোগাযোগ করেন এবং এই পুরো ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা বা অর্থায়ন থাকতে পারে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে যে, ভুক্তভোগীর ভাইয়ের ভূমিকা এবং পলাতক বাকি আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করতে ব্যাপক আইনি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঘটনার পর থেকে আদাবর ও তৎসংলগ্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অপরাধের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির বিন্যাস অত্যন্ত প্রফেশনাল রাখা হয়েছে এবং বড় সাব-প্যারাগ্রাফ ব্যবহারের মাধ্যমে রিপোর্টের গভীরতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








