শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত নয়: মির্জা ফখরুল
ছবি: সংগৃহীত
ঠাকুরগাঁওবাসীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নবপ্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) সকালে ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের তাঁতীপাড়া কালীবাড়ী বড় মাঠের পশ্চিম পাশে বিশ্ববিদ্যালয়টির অস্থায়ী কার্যালয় ও ভবনের ফলক উন্মোচন করে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পরবর্তীতে আয়োজিত পৃথক আলোচনা সভায় মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, উচ্চশিক্ষার এই বিদ্যাপীঠে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক তদবির, দলীয় প্রভাব কিংবা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করা হবে না। সম্পূর্ণ মেধা ও সর্বোচ্চ যোগ্যতার ভিত্তিতেই এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একই দিনে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধন শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার মান রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয় যে এখানে মুখ দেখে কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এটি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি পবিত্র স্থান। এখানে রাজনৈতিক বা দলীয় কোনো চাপ প্রয়োগ করতে দেওয়া হবে না। আমি নিজে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও পরিষ্কারভাবে বলছি, আমরা কোনো চাপ সৃষ্টি করব না এবং অন্য কাউকেও তা করতে দেব না।
তিনি নবনিযুক্ত উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইতিমধ্যে নিয়োগের জন্য তাঁর ওপর এবং উপাচার্যের ওপর নানা পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়েছে, তবে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থেকে কেবল দেশের সবচেয়ে সেরা মেধাবীদেরই এখানে শিক্ষক হিসেবে বেছে নিতে হবে। এই কঠোর বাস্তবতায় কারও মন খারাপ করার কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে স্থান করে নেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মানেই বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথাগত সার্টিফিকেট সর্বস্ব ও বেকারত্ব তৈরিকারী শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সব আধুনিক, বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী বিভাগ খুলতে হবে, যা পড়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। এটি কেবল প্রচলিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হবে না, বরং গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের গৌরব বয়ে আনবে।
স্থানীয় জনগণের উদ্দেশে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের বয়স হয়েছে, কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। এটি ঠাকুরগাঁওয়ের অহংকার ও গর্বের জায়গা। একে দেশের শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে সবাইকে দলমত নির্বিশেষে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম আগামী ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রী জানান, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভাতারমারি ইক্ষু খামারে প্রায় ১০০ একর জমির একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিজমির সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে তিনি একটি পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পরিকল্পনার কথা জানান।
আরও পড়ুন: অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুলের ঈদ শুভেচ্ছা
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত কৃষিজমি নষ্ট করা হবে না। যতটুকু জমি না হলেই নয়, ঠিক ততটুকু জমি অধিগ্রহণ করে অনুভূমিক বিস্তৃতির পরিবর্তে ‘ভার্টিক্যাল’ বা উল্লম্ব পদ্ধতিতে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের পূর্বে ঠাকুরগাঁও সফরে এলে স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ ও দুটি নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওবাসীর সেই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, উপাচার্য নিয়োগ এবং প্রাথমিক আর্থিক অনুদান বরাদ্দ দিয়েছেন। একই সাথে মেডিকেল কলেজ ও নতুন দুটি উপজেলার দাবিও মঞ্জুর করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীনের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম (জাহিদুর রহমান), ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক (রফিকুল রহমান), পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী ও অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে সহ স্থানীয় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি শেষে দুপুর ১১টায় জেলা শহরের কালীবাড়িতে অবস্থিত মির্জা রুহুল আমিন মিলনায়তনে জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় মিলিত হন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সভায় দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এক চরম অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের মন্ত্রীরা দেশের ব্যাংকগুলো খালি করে দিয়েছে, প্রায় ৮০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। এই শূন্য অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে বর্তমান সরকারকে পুনরায় সবকিছু শুরু করতে হয়েছে। গত তিন মাসে সরকারের পক্ষ থেকে যে উন্নয়নমূলক সংস্কারের চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা সফল করতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমকে একটি যুগান্তকারী ও কল্যাণমুখী উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময় সভায় দেশের নতুন প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেন বিএনপি মহাসচিব।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে এক নতুন গণতান্ত্রিক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকদের দেশ ও মানুষের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দায়িত্বহীন ও অপসাংবাদিকতা দেশ ও জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেকোনো সংবাদ প্রকাশের আগে অবশ্যই অভিযুক্ত বা বিপরীত পক্ষের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া নেওয়া উচিত, যা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল শর্ত। এই পেশাদারত্ব বজায় রাখার জন্য সাংবাদিকদের প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণার আহ্বান জানান তিনি।
দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক কিংবদন্তি সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, মানিক মিয়া নিজে কখনো মন্ত্রী হননি, কিন্তু তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মন্ত্রী তৈরি করেছেন এবং সমাজ গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
সাংবাদিকতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশা উল্লেখ করে মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সংবাদকর্মীরা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হননি। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার প্রকৃত রহস্য ও বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে চরম ঐক্যের অভাব রয়েছে। এই বিভক্তির সুযোগ নিয়েই অনেক গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী ন্যায্য বেতন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে সব ভেদাভেদ ভুলে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও জেলার সার্বিক উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও ইতিবাচক দিকগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান মন্ত্রী।
ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎফর রহমান মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল লতিফসহ জেলার প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








