‘সন্ত্রাস-মাদক-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বহুল আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর ও তার আশপাশের পাহাড়ে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অঞ্চলটিকে চিরতরে অপরাধমুক্ত করতে এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকার।
রবিবার (৩১ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
পরিদর্শন শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অপরাধী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, দেশের কোথাও কোনো সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য বা আস্তানা থাকতে দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে জানান, জঙ্গল সলিমপুরের স্থানীয় প্রকৃত অধিবাসী ও সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; কাউকেই আকস্মিক উচ্ছেদ না করে বরং সরকারি উদ্যোগে তাদের টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে অবৈধ দখলদার ও ভূমিদস্যুদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী বেতুয়া ও চা-বাগান এলাকায় সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র এক ধরনের সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই চক্রের বেপরোয়া মনোভাব ও আইনশৃঙ্খলার ওপর বড় ধরনের আঘাতের প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। সেই ঘটনার পর গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি বড় ধরনের সমন্বিত ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আলীনগরে একটি অস্থায়ী যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ অকপটে স্বীকার করেছেন যে, কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে সেই অভিযানের মূল লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতির মধ্যে গত ২৪ মে গভীর রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নেতৃত্বে কয়েকশ সশস্ত্র অপরাধী ভারী বুলডোজার নিয়ে সেই অস্থায়ী যৌথ ক্যাম্পে এক দুঃসাহসিক হামলা চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক গুলিবিনিময়ের পর হামলাকারীরা ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পথ রুদ্ধ করতে ভেতরের সড়ক কেটে বড় বড় গর্ত করে পাহাড়ের গভীরে পালিয়ে যায়। এই ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় গত ২৬ মে সীতাকুণ্ড থানায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ৩০০ অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
আজকের পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের ‘দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র’ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, যার একটি প্রত্যক্ষ ও নগ্ন নমুনা হচ্ছে এই জঙ্গল সলিমপুর। সন্ত্রাসীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিজস্ব পাহারা বসিয়ে এই দুর্গম অঞ্চলে নিজেদের যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তা যৌথ অভিযানের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো দুঃসাহস অপরাধীরা কীভাবে পেল, তা অত্যন্ত কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার পেছনে থাকা মূল ভূমিদস্যু, ইন্ধনদাতা ও কুশীলবদের ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে এবং তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
আরও পড়ুন: জিয়াউর রহমানের আদর্শে বৈষম্যহীন দেশ গড়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান সরকারের গত এক মাসের অগ্রাধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের কিছু ব্যবসায়ীর বাসভবনে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলিবর্ষণ এবং চাঁদা আদায়ের মতো ঘটনা ঘটার পর থেকেই সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জঙ্গল সলিমপুর পরিস্থিতি তদারকি করছে। যদি কেউ উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে, তবে কোনো ভয় না পেয়ে সরাসরি নাম উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দেওয়ার জন্য তিনি স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান।
জঙ্গল সলিমপুরকে একটি নিরাপদ, আধুনিক এবং মূল ধারার অর্থনৈতিক জনপদে রূপান্তর করতে সরকারের মহাপরিকল্পনার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, সলিমপুর ইউনিয়নের সাথে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ ঘটিয়ে একটি অত্যন্ত আধুনিক ও সমন্বিত রোড নেটওয়ার্ক বা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ইতিমধ্যেই ড্রোন চিত্র এবং সড়ক মানচিত্র নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে এই অঞ্চলে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী অবকাঠামো ও সেনানিবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে বায়েজিদ লিংকের আশেপাশের সরকারি খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের যে দীর্ঘদিনের প্রকল্পটি ঝুলে ছিল, তার প্রশাসনিক অনুমোদনের আলোকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, জঙ্গল সলিমপুর আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। শুধু জঙ্গল সলিমপুরই নয়, এর আশপাশের অপরাধপ্রবণ বেতুয়া ও পাহাড়ি চা-বাগান এলাকা থেকেও সন্ত্রাসীদের চিরতরে উচ্ছেদ ও নির্মূল করা হবে।
কেবল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অপরাধ দমনেই নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এদিন দেশজুড়ে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে আইনি সংস্কার ও যুগোপযোগী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সারা দেশে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। এই চারটি অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।
বিদ্যমান শতাব্দী প্রাচীন বা দুর্বল আইনগুলোর সীমাবদ্ধতা দূর করার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত জুয়া আইন দিয়ে বর্তমান সময়ের অনলাইন-নির্ভর ও অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতির ডিজিটাল জুয়া বা ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনি দুর্বলতার কারণে এই অপরাধের কার্যকর মোকাবিলা ব্যাহত হচ্ছে, তাই আগামী সংসদ অধিবেশনেই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নতুন আইন বা কঠোর সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে বছরের পর বছর ধরে পেন্ডিং বা বিচারাধীন থাকা হাজার হাজার মাদক মামলার দ্রুত রায় নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ‘কিশোর গ্যাং’-এর ক্রমবর্ধমান নৃশংসতা ও বেপরোয়া তৎপরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের নানা ফাঁকফোকর ও সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করে অনেক কিশোর গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং ধীরে ধীরে ভয়ংকর ও পেশাদার সন্ত্রাসী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। কিশোর গ্যাংয়ের এই সংস্কৃতিকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে এবং কিশোর অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার সাধন করা হবে।
আজকের এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জঙ্গল সলিমপুরের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং এর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরজমিনে পর্যবেক্ষণ শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রামের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় অংশ নিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ব্রিফিংয়ের শেষভাগে মন্ত্রী দেশে স্থায়ীভাবে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে গণমাধ্যমকর্মীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা ও জনসম্পৃক্ততার আহ্বান জানান।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








