আদ্-দ্বীনের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে মিলেছে নির্মাণ গাফিলতি
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক ও আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির ডেলিভারি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের অবকাঠামোগত নির্মাণে গুরুতর গাফিলতি ও সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু ত্রুটির সন্ধান পেয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল।
শুক্রবার (২৯ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, তদন্তে ওই ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন (বায়ু চলাচল) ব্যবস্থায় চরম অবহেলা ও ত্রুটি ধরা পড়েছে, যা শিশুদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক মৃত্যুর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বুধবার (২৭ মে) সকালে হাসপাতালের ডেলিভারি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক থেকে তিন দিন বয়সী এই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং হাসপাতালের চিকিৎসা পরিবেশ, অব্যবস্থাপনা ও রোগী নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তদন্তের অগ্রগতি ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি মূলত অত্যন্ত ‘সাফোকেটিভ’ বা বদ্ধ অবস্থায় ছিল, যা কোনোভাবেই নবজাতকদের রাখার মতো উপযোগী ছিল না। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেছে, কক্ষটিতে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে বাতাস বের হওয়া কিংবা প্রবেশ করার মতো কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থাই রাখা হয়নি; সেখানে কেবলমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু ছিল। দীর্ঘ বছর ধরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোতেই পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটি পরিচালনা করে আসছিল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের সম্পূর্ণ এসি-নির্ভর কক্ষে যদি কোনো কারণে এসি বন্ধ হয়ে যায়, তবে মুহূর্তের মধ্যে সেটি একটি চরম শ্বাসরুদ্ধকর ও অক্সিজেন সংকটের গ্যাস চেম্বারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাসপাতালের এই ত্রুটিপূর্ণ ও অনিরাপদ পরিবেশ শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর ঠিক কতটা এবং কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা তদন্ত প্রতিবেদনে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীনের করিডরে স্বজনদের আহাজারি
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (২৬ মে) দিবাগত রাতে মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটিতে ১১ জন প্রসূতি মা এবং এই ছয় নবজাতক একসঙ্গে ভর্তি ছিলেন। রাতের কোনো একপর্যায়ে ওয়ার্ডের ভেতরে অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় এক প্রসূতি মা দায়িত্বরত নার্সকে সাময়িকভাবে এসি বন্ধ রাখার অনুরোধ করেন। প্রসূতির অনুরোধে নার্স প্রায় এক ঘণ্টার মতো এসি বন্ধ রাখেন। তবে কিছু সময় পর ঘরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র গরম ও ভ্যাপসা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নার্স আবারও এসি চালু করেন। কিন্তু এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই এসি-নির্ভর বদ্ধ কক্ষে বাতাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় চরম অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। এসি পুনরায় চালু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটি নবজাতক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তড়িঘড়ি করে তাদের এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেওয়ার পরামর্শ দেন। পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডে থাকা বাকি শিশুদের অবস্থারও দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত বুধবার ভোরের দিকে একে একে ছয়টি কোমলমতি নবজাতকই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশ প্রশাসনও ধারণা দেয় যে, পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডের এসি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণে এবং বিকল্প বায়ু চলাচল ব্যবস্থা না থাকায় নবজাতকদের শরীরে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা ও শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়েছিল। তবে নিহত শিশুদের স্বজনরা এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন; তারা শুরু থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা এবং ডাক্তার ও নার্সদের দায়িত্বে অবহেলাকেই এই 'গণ-মৃত্যুর' জন্য সরাসরি দায়ী করছেন। এই অবহেলার অভিযোগে ইতিপূর্বেই এক ভুক্তভোগী নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে দাবি করেছে যে, তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সরকারি সব সংস্থাকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত তথ্য ও নথি দিয়ে সহযোগিতা করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৬ নবজাতকের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তদন্তের অংশ হিসেবে গত দুই দিনে তদন্ত কমিটির সদস্যরা হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের সামগ্রিক পরিবেশ, কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, এয়ার সার্কুলেশন বা বায়ু চলাচল পদ্ধতি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত নকশা গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছেন।
একই সাথে তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের বক্তব্য রেকর্ড করেছেন। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট সব আইনি ও প্রযুক্তিগত তথ্য পর্যালোচনার কাজ শেষ হয়েছে। আজ বা আগামীকাল শনিবার (৩০ মে) এই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনটি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রতিবেদনে শুধু মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়-দায়িত্বই নির্ধারণ করা হয়নি, বরং ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো হাসপাতালে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সুপারিশমালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








