নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:২৯, ২৭ মে ২০২৬

আদ-দ্বীনের করিডরে স্বজনদের আহাজারি

আদ-দ্বীনের করিডরে স্বজনদের আহাজারি

ছবি: সংগৃহীত

আর মাত্র একদিন পরেই মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। যখন দেশজুড়ে ঘরে ঘরে চলছে ঈদের আনন্দ আর উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, ঠিক তখনই রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে নেমে এসেছে এক চরম ও ভয়াবহ অন্ধকার। মাত্র ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে, হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডেই প্রাণ হারিয়েছে ১১টি নিষ্পাপ নবজাতক। 

স্বজনদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাই এই গণমৃত্যুর মূল কারণ। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যার দ্বিমত পোষণ করে মৃতের সংখ্যা ৬ বলে দাবি করেছে। এই ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে চরম উত্তেজনা, শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের বাতাস। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠন করেছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি।

বুধবার (২৭ মে) ভোরের আলো ফোটার আগেই আদ-দ্বীন হাসপাতালের প্রসূতি ও নবজাতক ওয়ার্ডে এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। 

ঘটনার বিবরণ দিয়ে নবজাতকদের স্বজনরা জানান, মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা শিশুরা হঠাৎ করেই তীব্রভাবে কান্না এবং বমি করা শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ওয়ার্ডের ভেতরের বাতাস ভারী ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যার ফলে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসাধীন শিশুদের মায়েরা এবং স্বজনরা ওয়ার্ডে কর্তব্যরতদের বারবার ডাকলেও রাতে সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা নার্স উপস্থিত ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সময়মতো জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সকালের আলো ফোটার আগেই একে একে নিস্তব্ধ হতে থাকে আলো হয়ে পৃথিবীতে আসা ছোট প্রাণগুলো। 

স্বজনদের অভিযোগ, এসির গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া বা গ্যাস পুরো ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ায় এই শ্বাসকষ্ট ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডিতে ঠিক কতজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যে চরম বৈপরীত্য দেখা গেছে। 

হাসপাতাল প্রশাসনের দাবি, দুর্ঘটনায় মোট ৬টি শিশু মারা গেছে। তবে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং সেখানে দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স মৌসুমির দেওয়া তথ্যমতে, ওই ওয়ার্ডটিতে মোট ১১ জন নবজাতক ভর্তি ছিল এবং তাদের সবারই মৃত্যু হয়েছে। ১ থেকে ৩ দিন বয়সী এই শিশুদের সিজারিয়ান অপারেশনের পর নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মায়েদের সঙ্গে ওই ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। 

চিকিৎসাধীন শিশুদের স্বজনদের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের গাফিলতি ও দায় লুকাতে শুরু থেকেই প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নতুন অতিথিকে নিয়ে যে পরিবারগুলো হাসিমুখে বাড়ি ফেরার এবং আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপনের অপেক্ষায় ছিল, আজ তারা হাসপাতাল থেকে ফিরছে সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা শান্ত নামের এক বাবা মাত্র দুই দিনের সন্তানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

তিনি আর্তনাদ করে বলেন, জন্মের পর পৃথিবীর আলো ঠিকমতো দেখতেই পারল না আমার বাচ্চাটা। এ কি ভয়াবহতার মুখোমুখি হলাম আমরা! আমাদের ঈদ চিরতরে শেষ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম নতুন অতিথিকে নিয়ে এবার কত আনন্দ করব, কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।

অনুরূপ এক করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন চাঁদপুরের হাবিবুর রহমান। তিনি এক দিকে নিজের নবজাতক সন্তানকে দাফন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্য দিকে হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন তার অসুস্থ সহধর্মিণীকে এই নির্মম সত্য কীভাবে জানাবেন, তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

একই ওয়ার্ডে সন্তান হারানো এক দাদি তীব্র ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, রাতে বাচ্চারা যখন একের পর এক অসুস্থ হয়ে পড়ছিল, তখন ওয়ার্ডে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। ভোরবেলায় তার নাতনিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে (NICU) নেওয়ার কথা বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধ কেনার জন্য কয়েক হাজার টাকা খরচ করায়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে শেষ পর্যন্ত জানানো হয় শিশুটি আর বেঁচে নেই। চিকিৎসকরা যদি পরিস্থিতি সামাল দিতেই না পারতেন, তবে কেন আগে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হলো না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এই নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে আদ-দ্বীন হাসপাতালের ডিরেক্টর জেনারেল প্রফেসর নাহিদ ইয়াসমিন গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

আরও পড়ুন: ৬ নবজাতকের মৃত্যুর তদন্তে আদ-দ্বীন হাসপাতালে বোম ডিসপোজাল ইউনিট

তিনি বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতালের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন দুর্ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। আমরা এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। তবে তিনি ১১ জনের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করে বলেন, ওই ওয়ার্ডে মোট ১১ জন মা এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ ৬ জন শিশু ছিল।

দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনেক সময় রোগী বা তাদের স্বজনরা অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে এসি বন্ধ রাখার অনুরোধ করেন। ঘটনার রাতেও হয়তো এসি বন্ধ রাখায় বাতাস চলাচল ব্যাহত হতে পারে। 

হাসপাতালের ইন্টারনাল রিপোর্টের বরাতে তিনি জানান, রাত আনুমানিক তিনটার দিকে দুটি শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল মনে করে পুনরায় ওয়ার্ডে ফেরত পাঠান। কিন্তু ভোর ৬টার পর দায়িত্বরত নার্স ও মায়েরা শিশুদের পুনরায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরবর্তীতে ৬ নবজাতককেই দ্রুত NICU-তে স্থানান্তর করা হলে দুই শিশুকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বাকি চারজনকে লাইফ সাপোর্টে (ভেন্টিলেটর) রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তারা মারা যায়।

সুনামধন্য এই হাসপাতালে এমন রহস্যজনক ও গণমৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসা অন্যান্য রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কথা হয় চাঁদপুর ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে। 

খিলগাঁও থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, আদ-দ্বীন হাসপাতালের এক সময় নরমাল ডেলিভারি ও সুলভ মূল্যের চিকিৎসাসেবার জন্য বেশ সুনাম ছিল, কিন্তু এখন তারা সেই সুনামকে অপব্যবহার করছে। বর্তমানে এখানকার ডাক্তার, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আচরণ অত্যন্ত নিম্নমানের।

চাঁদপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আসা অপর এক যুবক অভিযোগ করেন, জরুরি প্রয়োজনে ডাকলেও নার্সরা কোনো কথা শোনেন না বা উত্তর দেন না। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে যে, অদক্ষ জনবল নিয়োগের কারণেই হাসপাতালের সেবার মান ভেঙে পড়েছে। 

এদিন দুপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা এক নারীর স্বামী অত্যন্ত চিন্তিত মুখে জানান, হাসপাতালের এই অরাজক পরিস্থিতি এবং নবজাতকদের মৃত্যুর খবর দেখার পর তিনি নিজের স্ত্রীর সিজার এখানে করাতে আর কোনো ভরসা পাচ্ছেন না।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের রমনা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) কারিগরি ত্রুটি বা গ্যাস লিকেজের বিষয়টিই এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা বা চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্য দিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজি হেলথ) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই রহস্যজনক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঈদ আনন্দের ঠিক আগমুহূর্তে একসঙ্গে এতগুলো নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানির এই ক্ষত হয়তো কোনোদিন পূরণ হবে না, তবে ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি এখন দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়