নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৮, ২৭ মে ২০২৬

৬ নবজাতকের মৃত্যুর তদন্তে আদ-দ্বীন হাসপাতালে বোম ডিসপোজাল ইউনিট

৬ নবজাতকের মৃত্যুর তদন্তে আদ-দ্বীন হাসপাতালে বোম ডিসপোজাল ইউনিট

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। 

বুধবার (২৭ মে) ভোরের দিকে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ (পোস্ট ডেলিভারি) ওয়ার্ডে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। একসঙ্গে এতগুলো শিশুর আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালজুড়ে এক চরম উত্তেজনা ও শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 

ঘটনার প্রকৃত কারণ, রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং এর পেছনে কোনো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিটসহ প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিবিড় তদন্ত শুরু করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায়, বুধবার সকাল ৬টার দিকে পোস্ট-অপারেটিভ রুমে থাকা নবজাতকদের মায়েরা কর্তব্যরত নার্সদের জানান যে তাদের সন্তানদের হঠাৎ বেশ অসুস্থ মনে হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থ ছয় নবজাতককে হাসপাতালের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এনআইসিইউতে নেওয়ার পথেই দুটি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাকি চার শিশুর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর ও আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্টে নিয়ে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। তবে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে একে একে বাকি চার শিশুও মারা যায়। এ ঘটনায় কেবল ওই ছয় শিশুই নয়, এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন আরও পাঁচ নবজাতকের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, চিকিৎসাধীন এই শিশুদের শরীর এরই মধ্যে নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে, যা কোনো তীব্র বিষাক্ত উপাদানের প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে।

এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে এসে পৌঁছায় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। বেলা ১১টার দিকে তারা হাসপাতালের আক্রান্ত পোস্ট-অপারেটিভ রুমে প্রবেশ করে দীর্ঘ ১ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালান। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের লক্ষে ক্রাইম সিন টিমের সদস্যরা কক্ষটির ভেতর থেকে বিভিন্ন আলামত, কাপড়ের টুকরো ও বায়বীয় নমুনা সংগ্রহ করেন। সিআইডির পর পরই দুপুর ২টার দিকে ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিটের পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল উন্নত প্রযুক্তির গ্যাস ডিটেক্টর ও আধুনিক ডিভাইস নিয়ে ওই কক্ষে প্রবেশ করে। তদন্তকারীরা কক্ষে প্রবেশ করে তীব্র ও অসহনীয় দুর্গন্ধের মুখোমুখি হন, যার ফলে সেখানে অল্প সময়ের বেশি অবস্থান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্তকারীদের অনেকেরই সাময়িকভাবে শ্বাসকষ্ট এবং চোখে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া শুরু হয়। 

তবে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বোম ডিসপোজাল ইউনিটের একজন সদস্য জানান, প্রাথমিকভাবে বাতাসে স্থায়ী কোনো মারাত্মক ক্ষতিকর বা বিস্ফোরক উপাদান মেলেনি। কক্ষে যে সামান্য গন্ধ পাওয়া গেছে, তা দীর্ঘ সময় এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) বন্ধ থাকার কারণে তৈরি গুমোট পরিবেশের ফল হতে পারে। তবে চূড়ান্ত রাসায়নিক পরীক্ষার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

শিশুদের স্বজনদের পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, নবজাতক ওয়ার্ডের এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের গ্যাস লিকেজ থেকেই এই বিষাক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং এর ফলেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার রহস্যজট খুলতে হাসপাতালে ছুটে আসেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, র্যাব, ডিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপি কমিশনার সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার সময় ওই পোস্ট-অপারেটিভ রুমে ৬ নবজাতকসহ মোট ১১ জন মা অবস্থান করছিলেন। রাতের কোনো একপর্যায়ে তীব্র ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় একজন মায়ের অনুরোধে কর্তব্যরত নার্স প্রায় এক ঘণ্টার জন্য এসি বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে কক্ষের পরিবেশ আবার গরম হয়ে উঠলে এসি পুনরায় চালু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথমে দুটি শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় বাকি চারটি শিশুও দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় শিশুরই মৃত্যু হয়। এই চক্রাকার এসি বন্ধ ও চালু করার প্রক্রিয়ায় যন্ত্রটি থেকে কোনো ক্ষতিকর ফ্রেন বা কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের মূল বিষয়।

সার্বিক বিষয়ে দুপুরের দিকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন। তিনি শিশুদের অসুস্থ হওয়া এবং এনআইসিইউতে নেওয়ার বিবরণ দিলেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, পুরো ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলামও জানিয়েছেন, পুলিশ সব ধরনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই কাজ করছে। সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিটের আধুনিক ডিভাইসের ডেটা বিশ্লেষণের পর এই নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও রহস্য সম্পূর্ণ উন্মোচিত হবে এবং কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়