News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৩১, ১ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ১৫:১১, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিআরটিএ কর্মকর্তার স্ত্রী হত্যাকাণ্ড

কৃষ্ণার শেষ ফোনালাপ

কৃষ্ণার শেষ ফোনালাপ

খুলনা: “কৃষ্ণা প্রতিদিন রাত নটা থেকে সাড়ে নটার দিকে আমাকে ফোন করতো। জানতে চাইতো, কী করছি, কেমন আছি, খেয়েছি কি না। কিন্তু ঘটনার দিন সোমবার রাত ১০টার পরও যখন সে ফোন করলো না, তখন আমি নিজেই তাকে ফোন করলাম।”

বুধবার দুপুরে নিউজবাংলাদেশ.কম প্রতিনিধির কাছে এই কথাগুলো বলছিলেন বিআরটিএ উপপরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের স্ত্রী কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস ওরফে টুপুরের বাবা কুমুদ রঞ্জন মণ্ডল।

তিনি বলছিলেন, “কিন্তু সোমবার রাত ১০টার পরও যখন ফোন করল না, তখন আমি ১০টা ১০মিটিটের সময়ে টুপুরকে ফোন করলাম। ফোন রিসিভ করেই মা আমার বলে উঠল, কী করো, বাবা? কী হয়েছে? এক কথা, দুই কথা বলতে বলতে মিনিট পাঁচেক পর বলে, বাবা ফোনটা একটু রাখ তো। পাশের ঘরে কীসের শব্দ হলো! আমি পাঁচ মিনিট পরে তোমাকে ফোন দিচ্ছি।”

তিনি বলছিলেন, “টুপুর চলে যাওয়ার পর বেশ খানিক সময় বসে থেকে ফোন না করায় আমি বারান্দা থেকে উঠে ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঠিক এ সময়ে আমার দিদা শ্রুতি ( কাবেরীর বড় মেয়ে) ভয়ার্তভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোন দিয়ে আমাকে বলে, দাদু, বাবাকে কে যেন মেরে ফেলতে চাইছে। মা বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি তাকে বললাম, দিদা, তুমি সিকিউরিটিকে ফোন করো। এ কথা বলে আমি আমার শ্যালক (চাচা শ্বশুরের ছেলে) পিন্টু বিশ্বাসকে ফোন করে বললাম, তুই, শিগগির টুপুরের বাসায় যা। দ্যাখ টুপুরের বাসায় কিছু ঘটেছে কি না।”
 
রাজধানী শহরে সোমবার রাত সোয়া ১০টার দিকে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে পূর্বপরিচিত দুর্বৃত্তের হামলা এবং তাদের দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা যান কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস ((৩৯) নামে এক গৃহবধূ। আহত হন স্বামী শীতাংশু শেখর বিশ্বাস, দুই মেয়ে অরিত্র বিশ্বাস (৯) এবং শ্রুতি বিশ্বাস (১৪)।

কৃষ্ণা কাবেরী টুপুরের বাবার বাড়ি খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার পঞ্চু গামে। বাবা কুমুদ রঞ্জন মণ্ডল ডুমুরিয়া উপজেলার সদরের ডুমুরিয়া ডিগ্রী কলেজের উপাধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি নিজ বাড়িতে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তার দিন কাটে মেয়ে, জামাই, নাতীদের নিয়ে।

এ বাড়ির দ্বিতল ভবনের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই দেখা যায়, তিনি আনমনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন।

সেখানে উঠে তাকে নমস্কার জানিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়া হলে তিনি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বসতে বলেন। এরপর দুএকটি কথা বলতে বলতে আহত জামাই শীতাংশু বিশ্বাস, নাতি শ্রুতি বিশ্বাস (১৪) ও অরিত্র বিশ্বাসের বর্তমান অবস্থা এবং চিকিৎসার খবর জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শুনেছি দুপুর আড়াইটায় ব্রেনে অপারেশন করা হবে।”
 
তিনি বলেন, “যে মেয়ের শরীরে কখনো সামান্য একটি নখের আচঁড় লাগেনি সেই নাকি আজ রক্তাক্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে হাসপাতালের অন্ধকার কুঠুরিতে পড়ে আছে।”

সেদিনকার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলতে থাকেন, “শ্রুতির ফোন পেয়ে কিছু একটা হয়েছে ভেবে আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে ঢাকায় আমার স্বজনদের একে একে খবর দিয়ে টুপুরের খবর নিতে বলেছিলাম।”

তারা সকলেই আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “কিছুই হয়নি; চিন্তা করবেন না।”
 
তিনি বলেন, “শ্রুতির ফোন পাওয়ার মিনিট দশেক পর অপরিচিত একটি ফোন থেকে জনৈক ব্যক্তি পুলিশ পরিচয় দিয়ে আমাকে বলে, খুনী আপনার জামাইয়ের পরিচিত। খুনীকে আমরা অবশ্যই গ্রেফতার করতে পারব।”

এরপর আবারও ফোন আসে কিন্তু এবার শ্রুতির।

শ্রুতি কৃষ্ণার বাবাকে জানায়, “ওই ব্যক্তির কাছ থেকে বাবাকে ছাড়াতে মা বাবাকে জড়িয়ে ধরে চেষ্টা করছে। মা তাকে বলছে, আপনার স্যারকে আপনি কী খাইয়েছেন? তাকে মারছেন কেন? কিন্তু লোকটি এর কোনো উত্তর না দিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করতে থাকে। সে মাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। পরে আগুন ধরিয়ে দিলে শ্রুতি নিজ ঘরে গিয়ে সিটকিনি আটকে দেয়।”

অবসরপ্রাপ্ত কলেজ উপাধ্যক্ষ কথা বলতে বলতে বার বার দীর্ঘশ্বাস নিতে থাকেন। তিনি বলেন, “মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জানতে পারি, আমার বড় মেয়ে কাকলী বিশ্বাস ওরফে তুতুন নওয়াপাড়া থেকে আমার এখানে আসছে, তখন আমার মনে হয় আরও বড় কোনো খারাপ খবর আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ দুর্ঘটনা ঘটল টুপুরের বাসা ঢাকায় আর তুতুন আসছে আমার বাড়ি। সে আসার আগে আমার এক স্বজন আমাকে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে জানায় টুপুর আর বেঁচে নেই।”
 
কুমুদ রঞ্জন মন্ডল কাবেরীর কথা বলতে গিয়ে তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ের বেশ কিছু ঘটনার কথা বলেন।
কান্না জড়িত কণ্ঠে কৃষ্ণার বাবা বলেন, “কৃষ্ণা (টুপুর) আমার মেয়ে ছিল না। ও ছিল আমার মা।”

তিনি বলেন, “ কৃষ্ণা (টুপুর) নিজের সন্তান, বাবা, মা, আত্মীয়-স্বজনদের যে শুধু খোঁজ নিতো, তা নয়। পরিচিত মানুষদের খোঁজ নেওয়া ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। টুপুর উচ্চ শিক্ষিত ছিল। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াকালীন তার বিয়ে হয়। বড় মেয়ে শ্রুতিকে বাসায় রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে সে। স্নাতকোত্তর শেষ করেছে। ঢাকার কলেজে সে চাকরিও নেয়। মেয়েরা বড় হচ্ছে এবং তাদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করতে হবে এই আকাঙ্ক্ষায় টুপুর এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চাকরি ছেড়ে দেয়। কিন্তু মেয়েদের মানুষ হওয়া তার আর দেখা হলো না।”

শীতাংশু শেখর বিশ্বাস ও কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস টুপুর দম্পতির ছোট মেয়ে অরিত্র বিশ্বাস (৯) তৃতীয় শ্রেণি এবং শ্রুতি বিশ্বাস (১৪) দশম শ্রেণিতে রাজধানীর দুটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে।  কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস টুপুরের শ্বশুর বাড়ি রাজবাড়ী জেলার দহোরপাচুড়িয়া গ্রামে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/কেজেএইচ

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়