কাঁটাতারের বেড়া যেখানে বিলীন হয়ে যায়
পঞ্চগড়: পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের অমরখানা সীমান্তে মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের মিলনমেলা। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ওই সীমান্তের ৭৪৩ ও ৭৪৫ নম্বর মেইন পিলারের মধ্যবর্তী প্রায় ৫ কিলোমিটার সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
১ বৈশাখের সারাটা দিন আবেগ আর প্রাণের উচ্ছ্বাসে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে তারা দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেছেন প্রাণের প্রিয় স্বজন-বান্ধবদের সঙ্গে। তবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা বা মিলনের আকাঙ্খা থাকলেও দুই পাড়ের নাগরিকদের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁটাতার, সৃষ্টি করেছে অশান্তি। এমন অবস্থায় কেউ কেউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। সবমিলিয়ে মিলনমেলাটি যেন একপর্যায়ে বিচ্ছেদমেলায় রূপ নেয়। দুই দেশের নাগরিকরাই বছরের অন্তত এই দিনটায় কাঁটাতারবিহীন দেখা-সাক্ষাতে সহযোগিতা করতে উভয় দেশের সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির পূর্বে পঞ্চগড় জেলার পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া, বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা বর্তমান ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অধীনে ছিল। পাক-ভারত বিভক্তির পর এসব এলাকা বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়। দেশ বিভক্তের কারণে উভয় দেশের নাগরিকদের আত্মীয়-স্বজন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দুই দেশের নাগরিক আত্মীয়-স্বজনরা তাদের বাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ পেতেন। কিন্তু ভারত সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পর অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। পাসপোর্ট করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভারত বা বাংলাদেশে যাতায়াত করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করা ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উভয় দেশের নাগরিকদের অনুরোধে বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় অমরখানা সীমান্তে দুই বাংলার এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এদিন বেলা ১১টায় বিএসএফ-বিজিবি দুইদেশের নাগরিকদের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এসময় বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো উভয় দেশের বিভিন্ন বয়সী মানুষ কাঁটাতারের বেড়ার কাছে আসে। কাঁটাতারের দুই পাড়ে অপেক্ষায় থাকা উভয় দেশের নাগরিকরা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করে। এসময় বিএসএফ ও বিজিবি কাঁটাতারের বেড়ার উভয় পাশে এসে নিজ নিজ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও নজরদরির দায়িত্ব পালন করে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, উভয় দেশের মানুষ কাঁটাতারের ওপর দিয়ে বিস্কুট চানাচুর দিচ্ছেন একে অপরকে। কেউবা আত্বীয় স্বজনদের দেয়ার জন্য ঠাণ্ডা পানীয় বোতল ছুড়ে মারছেন। কেউ কেউ বেড়ার এপার-ওপার হাত নাড়িয়ে এবং উচ্চস্বরে কথা বলে স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। স্বজন ও পরিচিতদের দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। এই নিখাদ আবেগভরা অসাধারণ দৃশ্য যারা পাশে দাঁড়িয়ে দেখেন- তাদের চোখও অশ্রুসজল হয়ে পড়ে, বুক মোচড় দিয়ে ওঠে নিজের স্বজন-বন্ধুর কথা মনে করে।
মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া, হাত দিয়ে কিছুটা স্পর্শ করা যায় শুধু দীর্ঘদিনের অদেখা স্বজন-বন্ধুকে। তবে তারচেয়ে বেশি হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ চলে যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। এমন দৃশ্যের মিলনমেলা বস্তুত রূপ নেয় বিচ্ছেদমেলায়।
জলপাইগুড়ি জেলা শহরের আসিরউদ্দিনের (৬৫) পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী এলাকার মসলিমা খাতুন। দীর্ঘ ১ বছর পর পর নববর্ষ উপলক্ষে ভাই-ভাবীর সঙ্গে দেখা করতে পেরে বেজায় খুশি। তবে কাঁটাতারের বাইরে এ আয়োজন হলে শান্তি পেতেন বলে জানান তিনি।
ঠাকুরগাঁও শহরের মেরিনা বেগম ভারতের কোচবিহার এলাকায় বসবাসরত খালাত ভাই-বোনদের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা করে শান্তি পাননি বরং কাঁটাতারের বিরুদ্ধে জমা হয়েছে ক্ষোভ। কোনো একটি স্থানে ভালোভাবে দেখার সুযোগ করে দেবে উভয় দেশের সরকার- এমন আশা আর দাবি করেছেন তিনি।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা শহরের সুলতানা বেগম ভারতের শিলিগুড়িতে থাকা ভাইদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ভাইদের জন্য পোলাও মাংশ ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছিলেন। দেখা করে এসব দিতে পেরে আনন্দ পেয়েছেন তিনি। কাঁটাতারের বাইরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা ভারতের অভ্যন্তরে গিয়ে আরও কাছাকাছি দেখা করা ও স্বাক্ষাৎ করার সুযোগের জন্য উভয় দেশের সরকারের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
অমরখানা এলাকার বৃদ্ধ জহিরউদ্দিন (৭০) জানান, “গরিব মানুষ বাবারে ভারতে গিয়ে ভাই-বোনদের দেখা করার উপায় নাই। পাসপোর্ট ভিসাও করিবা পারিনা। পহেলা বৈশাখে কাঁটাতারের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভাই-বোনদের সাথে দেখা করি। দূর থেকে দেখে মনটার শান্তি হয় না।”
এ দিনে বিজিবি ও বিএসএফের সম্মতিতে উভয় দেশের মানুষ দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। শুধু পঞ্চগড় জেলাবাসীই নয়, পাশ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং কোচবিহার জেলার লাখো মানুষ এই মিলন মেলায় অংশ নেন।
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) খালাপাড়া ক্যাম্প ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অমরখানা ক্যাম্পের সদস্যরা এই মিলনমেলায় উভয় পাশে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুল হক বলেন, “প্রতিবছর এখানে উভয় দেশের নাগরিকদের মিলনমেলা হয়ে থাকে। দুই দেশের নাগরিকরা যাতে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায় এজন্য আমরা বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা করে এই মিলনমেলার আয়োজন করি। বছরে এই একটি দিন উভয় দেশের নাগরিকদের একটা বিরাট পাওনা।”
নিউজবাংলাদেশ.কম/এএইচকে
নিউজবাংলাদেশ.কম








