News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:২৭, ৬ মে ২০১৫
আপডেট: ১১:১৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

ভাস্কর নভেরা আহমেদ আর নেই

ভাস্কর নভেরা আহমেদ আর নেই

ঢাকা: একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাস্কর নভেরা আহমেদ মারা গেছেন।

মঙ্গলবার তিনি মারা যান। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি ফ্রান্সের প্যারিস থেকে কিছু দূরের একটি শহরে বসবাস করছিলেন।

১৯৭৩ সালের পর নভেরা আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন এবং প্যারিসে বসবাস শুরু করেন।

নভেরা আহমেদের জন্ম ১৯৩০ সালে। তিনি ভাস্কর হামিদুর রহমান এর সঙ্গে জাতীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করছিলেন। দীর্ঘ অন্তরাল জীবনের পর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে প্যারিসে তার রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কেএম শামীম চৌধুরী বুধবার রাতে জানান, খ্যাতনামা ভাস্কর নভেরার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শোক জানিয়েছেন।

বছর খানেক ধরেই নভেরা আহমেদ শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। এ ছাড়া আক্রান্ত ছিলেন বয়সজনিত আরও নানা জটিলতায়। থেকে থেকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছিল তাঁকে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল চিকিৎসা নিয়ে চলে যান প্যারিসের হাসপাতাল থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে, শঁন পামেল নামে গ্রামে তাঁর স্বামীর বাড়িতে। গত সপ্তাহ থেকে তাঁর অবস্থার আবার অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি কিছুই খেতে পারছিলেন না। মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি কোমায় চলে যান। ২০১৫ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার প্যারিস সময় ভোর রাত তিনটা থেকে চারটার মধ্যে কোনো এক সময় নভেরা জীবনের সীমারেখা পেরিয়ে যান।

দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের অগ্রদূত নভেরা আহমেদ প্রায় ৪৫ বছর ধরে পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে নিভৃতে প্যারিসে বসবাস করছিলেন। চলেও গেলেন নীরবেই। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সবার চোখের আড়ালে থেকেই বিদায় নিলেন জীবন থেকেও।

নভেরার জন্ম সুন্দরবনে, ১৯৩০ সালে। কর্মসূত্রে নভেরার বাবা সৈয়দ আহমেদ কর্মরত ছিলেন সুন্দরবন অঞ্চলে। চাচা আদর করে নাম রাখেন নভেরা। ফার্সি শব্দ ‘নভেরা’র অর্থ নবাগত, নতুন জন্ম।

নভেরার পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদিঘির উত্তর পাড়। চাকরিসূত্রে পিতা সাইদ আহমেদ পরবর্তীতে কলকাতায় ছিলেন। নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতায়। তিনি কলকাতার লরেটা থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুলজীবনেই তিনি ভাস্কর্য গড়তেন।

১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত ভাগ হয়ে যাওয়ার পর তারা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লায় চলে আসেন। এ সময় নভেরা কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। পিতার অবসরগ্রহণের পর তাঁরা সবাই আদি নিবাস চট্টগ্রামে গিয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন নভেরা।

নভেরা লন্ডনে যান ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। লন্ডনে তখন তাঁর মেজ বোন শরীফা আলম বিবিসির একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন এবং বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন নাজির আহমেদ। নাজির আহমেদের ছোট ভাই হামিদুর রাহমান তখন ঢাকা আর্ট কলেজে পড়ছেন – কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের একজন তিনি, তাঁর সহপাঠী ছিলেন আমিনুল ইসলাম। হামিদ যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন নাজির আহমেদ তাঁকে নিয়ে গিয়ে প্যারিসের বোজ আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু হামিদ প্যারিসে থাকতে পারেননি, তিনি লন্ডনে ফিরে ভাইয়ের ফ্ল্যাটেই উঠলেন। আর তখনই নভেরার সঙ্গে পরিচয় হামিদের। লন্ডনে হামিদ সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টে ভর্তি হলেন।

নভেরা ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হলেন।

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমান একসঙ্গে ফ্লোরেন্সে যান। প্রথমে তাঁরা শিল্পী আমিনুল ইসলামের আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং পরে তিনজন একত্রে একটি স্টুডিওতে উঠে যান। নভেরা মাস দুয়েক শুধু ঘুরে দেখলেন। ডক্টর ফোগেল ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির নামে এক ইতালীয় শিল্পীর কাছে নভেরার নাম উল্লেখ করে একটি চিঠি দিয়ে দিয়েছিলেন। এই শিল্পীর সাহচর্যে নভেরা দোনাতেলোসহ প্রাচীন কয়েকজন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দুমাস তাঁর কাছে কাজ শেখেন। ফ্লোরেন্স থেকে ভেনিসে গেলেন নভেরা ও হামিদ এবং সেখান থেকে লন্ডন।

নভেরা আহমেদের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়। ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট রোববার বিকেলে অন্তর্দৃষ্টি বা Inner Gaze শীর্ষক এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আজম খান।

দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীর সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রচলিত আছে। মেহবুব আহমেদের মতে, ‘১৯৬৮ সালের শেষদিকে ব্যাংককে নভেরা আহমেদের একক প্রদর্শনী হয়।’ শিল্প ও শিল্পীর দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ২০১২) প্রকাশিত ‘নভেরা – নতুন পথের দিশারী’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি আক্ষেপ করেছেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, নভেরার প্যারিসে করা যে-কাজগুলো ব্যাংককে প্রদর্শিত হয়েছিল তার কোনো নিদর্শন পাইনি, এমনকি ব্রোশারও নয়।’

১৯৬১ সালে ভাস্কর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন নভেরা আহমেদ। ১৯৯৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়ন। তাঁকে নিয়ে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই একটি জীবনী উপন্যাস লিখেছেন নভেরা নামে, যা ১৯৯৪ (প্রকাশ ১৯৯৫), নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র (নহন্যতে, এন রাশেদ চৌধুরী, ১৯৯৯)। জাদুঘরের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল’।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এজে

চয়ন খায়রুল হাবিবের কবিতা নভেরায় হংসনিল

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়