কক্সবাজার সৈকত দখলমুক্ত রাখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর অভিযান
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় বালিয়াড়ির ওপর কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা রাখা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার (২২ মার্চ) বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে উচ্ছেদকৃত এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতের সমস্ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করা হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
সৈকত পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও শাহজাহান চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এবং পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
গত ৯ মার্চ কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক সপ্তাহের মধ্যে বালিয়াড়ির ভাসমান অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসন সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক ঝুপড়ি দোকান ও অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।
উচ্ছেদ পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, সৈকত দখল করে গড়ে ওঠা বালিয়াড়িতে কোনো স্থাপনা থাকবে না। এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল শুরু, এটি টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
দীর্ঘদিন পর সৈকতের ঝুপড়ি বস্তি মুক্ত হওয়ায় পর্যটনের চেহারায় ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান জানান, প্রতিবছর ৬০-৭০ লাখ পর্যটক এখানে আসলেও বালিয়াড়িতে অবৈধ ঝুপড়ি ও সেখানে ঘটা নানা অপরাধের কারণে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করতেন। এখন স্থাপনা সরে যাওয়ায় সড়ক থেকেই সমুদ্রের নীল ঢেউ ও বিশাল বালিয়াড়ি দৃশ্যমান হচ্ছে, যা আসন্ন ঈদে পর্যটকদের জন্য এক নতুন উপহার।
আরও পড়ুন: সারাদেশে দুর্ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক, তদন্ত ও ব্যবস্থার নির্দেশ
উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি সৈকতে দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলে আসা ‘কার্ড বাণিজ্য’ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের নামে যে পাঁচ শতাধিক পরিচয়পত্র (কার্ড) দিয়েছিল, তার বড় অংশই বহিরাগতদের দখলে। বছরে ১০ হাজার টাকায় নবায়ন করা এই কার্ডগুলো কার্ডধারীরা অন্যদের কাছে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় ভাড়া দিচ্ছেন। পরিবেশবিষয়ক সংস্থা 'ইয়েস'-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক দাবি করেন, এই কার্ড বাণিজ্য থেকে বছরে অন্তত ১৫ কোটি টাকা আয় হলেও তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সরকার পরিবর্তনের সুযোগে একটি চক্র এই বাণিজ্য জিইয়ে রেখে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এই কার্ড প্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা জরুরি। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই অর্থ সৈকত রক্ষণাবেক্ষণ ও আলোকায়নের কাজে ব্যয় হয়।
সৈকত পরিদর্শনের আগে দুপুরে পেকুয়া সরকারি মডেল জিএমসি ইনস্টিটিউশন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সেখানে তিনি সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, বিগত সময়ের সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল বেকার তৈরি করেছে। বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে।
তিনি দক্ষ জনশক্তি গড়তে কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মেধাভিত্তিক দেশ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সৈকত রক্ষায় প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতকে যেকোনো মূল্যে দখলমুক্ত রাখা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








