বেপরোয়া গতিতে বিষাদ ঈদ আনন্দ, পঙ্গু হাসপাতালেই ভর্তি ৪০০
ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজধানীসহ সারাদেশের সড়কগুলো যখন যানজটমুক্ত ও শান্ত থাকার কথা, ঠিক তখনই এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতা। ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিয়ে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে জখম হওয়া মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদ রাত (শনিবার) থেকে রবিবার (২২ মার্চ) বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাঁদ রাত ১২টা থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় ২৬৬ জন এবং ঈদের দিন রাত ১২টা থেকে রবিবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত আরও ১২৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক আহতের মধ্যে ১০২ জনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেও চিত্রটা প্রায় একই। ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. ফারুক জানান, শুধুমাত্র ঈদের দিনই এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ১৫১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই সড়ক দুর্ঘটনায় জখম হয়েছেন।
রবিবার দুপুরে নিটোরের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ১০ শয্যার এই বিভাগে তিল ধারণের জায়গা নেই। একের পর এক ট্রলি ও স্ট্রেচারে করে রক্তাক্ত রোগীদের নিয়ে আসা হচ্ছে। শয্যা না পেয়ে অনেককেই মেঝেতে বা স্ট্রেচারে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
আরও পড়ুন: ৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ৩ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৯
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা যুবক বিপ্লবের ঘটনাটি এই বেপরোয়া গতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিন বন্ধু মিলে এক মোটরসাইকেলে ঘোরার সময় দ্রুতগতির একটি অটোরিকশার ধাক্কায় তারা ছিটকে পড়েন। বিপ্লবের ডান পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে গাজীপুর যাওয়ার পথে অটোরিকশার ধাক্কায় গোড়ালি পিষ্ট হওয়া মানিকের মতো শত শত মানুষ এখন হাসপাতালের করিডোরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়ে যায়, তবে এবারের ট্রেন্ডে দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার আধিক্য। গত বছর তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনা বেশি থাকলেও এবার দু-চাকার যানের গতি ও অসতর্কতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নিটোর কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রতি শিফটে ১৮ জন করে চিকিৎসক নিয়োজিত রাখা হয়েছে এবং নার্স ও সহায়তাকারীসহ অতিরিক্ত জনবল স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. এহসানুল কবির জানান, ছুটির আমেজ থাকলেও তাদের কোনো বিশ্রাম নেই; নিরবচ্ছিন্নভাবে রোগীদের অস্ত্রোপচার ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসবের সময়ে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা কমে যাওয়া এবং ফাঁকা রাস্তায় গতির মরণখেলায় মেতে ওঠাই এই রক্তপাতের প্রধান কারণ। হেলমেট ব্যবহারে অনীহা এবং এক মোটরসাইকেলে তিন বা ততোধিক আরোহী থাকায় সামান্য আঘাতেই বড় ধরনের পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছেন তরুণরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ছাড়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








