পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের শাহবাগ অবরোধ, তীব্র যানজট
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশের বাধায় এই সংঘাত সৃষ্টি হয়।
এর প্রতিবাদে শুক্রবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।
মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছানোর পর তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা ‘ব্লকেড, ব্লকেড, শাহবাগ ব্লকেড’, ‘হাদি তোমায় দেখা যায়, ইনকিলাবের পতাকায়’, ‘কে বলেরে হাদি নাই, হাদি সারা বাংলায়’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’, ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’, ‘তুমি কে আমি কে, জাবির জাবির’ এবং ‘বাংলাদেশের জনগণ, নেমে আসুন, নেমে পড়ুন’সহ নানা স্লোগান দেন।
অবরোধের কারণে শাহবাগ মোড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে জাতীয় জাদুঘরের পাশের একটি অংশ দিয়ে সীমিতভাবে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়, যেখানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহবাগ থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল সংলগ্ন সড়ক থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, জলকামান ব্যবহার করে এবং টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এই পরিস্থিতি বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শুরু হয়ে থেমে থেমে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলে।
সংঘর্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
সংগঠনটির দাবি, আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা, রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার, জকসুর সদস্য শান্তা আক্তারসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ইমরান হোসেন জানান, আরও অনেককে ভর্তি ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সংঘর্ষের পর বিকেল ৫টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটি সবাইকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানায়।
পুলিশ জানায়, বিকেল ৪টার দিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে যমুনা অভিমুখে রওনা হলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেন এবং একটি অংশ জলকামানের ওপর উঠে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় জনস্বার্থে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ইটপাটকেল ও বোতল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে জলকামান থেকে পানি ছোড়া, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জের মাধ্যমে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো গুলি চালানো হয়নি এবং মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে কোনো বলপ্রয়োগ করেনি বলে দাবি করা হয়। ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা এবং জলকামানের ওপর উঠে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।
আরও পড়ুন: ইনকিলাব মঞ্চের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশও নিশ্চিত করেছে, এ সময় কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেল থেকে যমুনার সামনে এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। যমুনার সামনে অবস্থানকারীদের মধ্যে ছিলেন ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পাসহ কয়েকজন।
অন্যদিকে ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আব্দুল্লাহ আল জাবের ও সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হন।
শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থেকে কয়েকজন যমুনার দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়, এতে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে ‘পুলিশি অ্যাকশন’ শুরু হয়।
একই দিনে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে যমুনার সামনে অবস্থান নেওয়া সরকারি কর্মচারীদের ছত্রভঙ্গ করতেও পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে জড়ো হওয়া কয়েকশ আন্দোলনকারীকে সরিয়ে দেওয়ার সময় সেখানে অবস্থানরত ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরাও পুলিশের মুখে পড়ে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বানে শুক্রবার জুমার পর ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি অংশ যমুনার সামনে অবস্থান অব্যাহত রাখে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া শরিফ ওসমান হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগে গেলে চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলের পেছনে বসা এক ব্যক্তি তাকে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। তদন্ত শেষে গোয়েন্দা পুলিশ গত ৬ জানুয়ারি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অভিযোগপত্রে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭), অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








