News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৪৬, ৩০ মে ২০১৫
আপডেট: ১৪:১৫, ২২ নভেম্বর ২০২০

কমান্ডো ট্রেনিং: মৃত্যুকে ফেরত দেয়া হাসি

কমান্ডো ট্রেনিং: মৃত্যুকে ফেরত দেয়া হাসি

“Death smiles at us all, But all Man can do is smile back” কথাটি বলেছিলেন গ্লাডিয়েটর ছবিতে জেনারেল ম্যাক্সিমাস, কথাটি আমার মনে প্রচণ্ড দাগ কাটে। যে কোন দেশের স্পেশাল ফোর্স ট্রেনিংয়ে দুর্ঘটনা একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার, আমাদের কমান্ডো প্রশিক্ষণও এর ব্যতিক্রম নয়। এসব দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যাও কম নয়।

আমার এখনও মনে পরে লে. চৌধুরী স্যারের কথা, স্যার আমার ছয় মাসের সিনিয়র, তিনি তখন আর্মি কমান্ডো কোর্স করছেন আর আমি সিলেট অন্য একটি কোর্সে প্রশিক্ষণরত। প্রশিক্ষণের ফাঁকে আমি সুযোগ পেলেই স্যারের সাথে কথা বলতাম, প্রশিক্ষণের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা জানতাম আর রোমাঞ্চিত হতাম। দেখতে দেখতে তিনি প্রশিক্ষণের শেষে ফাইনাল এক্সারসাইজে গেলেন চোখে মুখে একজন কমান্ডো হবার এক দুর্বার স্বপ্ন নিয়ে। ফিরে এলেন বিষ্ফোরকের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে। (আল্লাহ্‌ তাকে বেহেশত্‌ নসীব করুন।)

এমন অনেক দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা আমার চাকরি জীবনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেখেছি। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে কাছ থেকে যে মৃত্যুটা দেখেছি তা ছিল সৈনিক হাবিবুর রহমান মিয়াজী, তার বাড়ি ছিল চাঁদপুরের মতলব থানায়। হ্যাঁ, আমাদের অনেককেই প্রশিক্ষণের সময় বিশেষ করে প্যারাসুট প্রশিক্ষণের সময় মৃত্যু খুব কাছ থেকে হেসে চলে গেছে, আমরা অনেকে তা দেখতে পেয়েছি, অনেকে পাইনি। প্যারাসুট প্রশিক্ষণে প্যারাসুট ঠিকমত না খোলা বা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা বা ঢাকা শহরে প্যারা ড্রপের পর বাতাসের জন্য সঠিক ড্রপ জোনে পৌঁছাতে না পেরে আহত হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কম বেশি আছে।

১৯৯৯ সাল, তখন আমরা ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের রেড (লাল) কোম্পানি নিয়ে লিজেন্ডারি কমান্ডো মেজর তৌহিদ (পরবর্তীতে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের ৭ম অধিনায়ক) স্যারের নেতৃত্বে রাজেন্দ্রপুর ২ মাসের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত। তৌহিদ স্যারের বিশেষত্ব ছিল তিনি সবসময়ই কমান্ডো প্রশিক্ষণের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন।

দিনটি ছিল ২৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার, আমরা সকাল শুরু করি একটি লং রান দিয়ে। আমাদের রুট ছিল রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী (BOF) হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা। সারা পথে স্যার আমাদের খুব একটা হাঁটার সুযোগ দেননি। সারা রাস্তায় কমান্ডোরা তাদের অভ্যাস অনুযায়ী গান গেয়ে গেয়ে যাচ্ছিল, এর মধ্যে সৈনিক হাবিবের একটি কথা আমার এখনও কানে বাজে তা হলো ‘আজকে উইকএন্ডে কে কে যাবি রে?’ হাবিব ছিল সদ্য বিবাহিত এবং দিনের প্রশিক্ষণ সেরে উইকএন্ড যাওয়ার জন্য উন্মুখ।

যা হোক, আমরা সকালের পিটি শেষে এক ঘণ্টা ছুটির পর দিনের অন্যান্য প্রশিক্ষণের জন্য ফলইন হলাম। সেই দিন কমান্ডো প্রশিক্ষণের দলকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল । আমি পরিচালনা করব উদ্ভাবিত উপায়ে বহুতলা বিল্ডিং থেকে অবতরণ, ক্যাপ্টেন শরীফ (RVFC) পরিচালনা করবে কুকুরের সহায়তার পলায়নরত শত্রুকে ধরা আর ক্যাপ্টেন মুসতাইন কুকুরের সাহায্যে বিষ্ফোরক খুঁজে বের করা।

প্রশিক্ষণের শুরুতে আমি ও তিনজন কমান্ডো সবাইকে কিভাবে রশি বেয়ে বহুতল বিল্ডিং থেকে অবতরণ করতে হবে তার ডেমো দেখালাম। এর পর একে একে সবাইকে একই প্রশিক্ষণ করাচ্ছিলাম, সৈনিক হাবিব ছিল আনুমানিক ৭/৮ নং, কমান্ডো হাবিব প্রশিক্ষণে রশি দিয়ে অবতরনের সময় যখন মাটি থেকে আনুমানিক ৭/৮ ফিট উপরে হঠাৎ করে হাত ছেড়ে দেয়, হাত ছেড়ে দেওয়ায় সে আর শরীরে ব্যালেন্স রাখতে না পেরে নীচে পড়ে যায়।

সৈনিক হাবিব যখন নীচে পড়ে তখন ভূমি থেকে তার মাথার উচ্চতা ছিল আনুমানিক ৬/৭ ফিট, আমরা তাকে সাথে সাথে স্থানীয় সিএমএইচ এ পাঠাই। কমান্ডো হাবিব সিএমএইচএ ইভাকুয়েট করার পরই আমি আবার দ্বীগুন উৎসাহে আমি নিজেই আবার সবাইকে অবতরণের পদ্ধতির ডেমো দেখিয়ে আবার প্রশিক্ষণ শুরু করি। আমার উদ্দেশ্যে ছিল কেউ যেন কমান্ডো হাবিবের এই দুর্ঘটনায় ভীত না হয়ে পড়ে এবং আমি তখন কারো মাঝে ভয়ের লেশমাত্র দেখতে পাইনি।

কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম আমি নিজে, যখন হাবিবের মৃত্যু সংবাদ পেলাম। আমি বা আমরা কেউই কল্পনা করতে পারিনি সৈনিক হাবিব মারা যাবে। কমান্ডো হাবিব যখন মাটিতে পড়ে তখন তার মাথা ছিল নীচে এবং মাথায় আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়। আমরা সবাই তখন শোকে পাথর। যারা আমরা সবাই সকালে এক সাথে পিটি করলাম, প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম, একে একে তার ব্যাচমেটরা এসে তাদের পুরানো স্মৃতি বলছিল আমরা কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আমরা পরবর্তীতে সবাই তার এবং তার রুহের মাগফেরাতের জন্য একক ও সম্মিলিতভাবে দোয়া করি। আমার ভিতর তখন প্রচন্ড একটা কষ্ঠ হচ্ছিল, কষ্টটা ছিল একজন কমান্ডোকে কঠোর প্রশিক্ষণে পাঠানো কিন্তু তার সেফটি নিশ্চিত না করার কষ্ট।

এই দুর্ঘটনার পর আমরা থেমে যাইনি, এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে। আমি অধিনায়ক হবার পর সিলেট জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে একটি হোস্টেজ রেসকিউ প্রশিক্ষণের সময় পাশের একটি উঁচু পাহাড় থেকে একই পদ্ধতিতে অবতরণ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করি, তবে এবার আমরা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছিলাম। তবে এই প্রশিক্ষণে আসলেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলতে কোন কিছু আছে কিনা আমি তা বিশ্বাস করি না। আল্লাহ তা’আলা পরম করুণাময় পৃথিবীর সকল আত্মনিবেদিত এই ঝঁকিপূর্ণ প্রশিক্ষণে নিয়োজিত সকল সৈনিকদের রক্ষা করুন।

আমি নিশ্চিত লে. চৌধুরী স্যার, সৈনিক হাবিবসহ সকল দেশের সার্বভৌম রক্ষার জন্য প্রশিক্ষণরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সৈনিকরা বেহেস্তের উচ্চতর আসনে অধীষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। আমিন

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএম

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়