‘দ্য তুরিন হর্স’ এর খোদা
৩ জানুয়ারি ১৮৮৯ সাল। তুরিন শহরতলির ভিয়া কার্লো এলবার্তোর ছয় নম্বর সদর দরজা ডিঙ্গাইয়া ফ্রিডরিখ নিৎসে হয়তো পায়চারি করিতে কিম্বা ডাকঘর হইতে তাঁহার চিঠি সংগ্রহ করিবেন বলিয়া বাহিরিয়া আসিলেন। অনতিদূরে কিম্বা বেশ কিছু দূরে এক ঘোড়াটানা গাড়ির চালক, গাড়োয়ানকে– জোসেপ্পে, কার্লো কিম্বা এত্তোরে... যে কোন ডাকনামের কাউরে- তাহার ঘাড়ত্যাড়া ঘোড়া নিয়া বিপাকে পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। অনেক দরকষাকষির পরও যখন ঘোড়া নড়িতে নারাজ তখন গাড়োয়ানের ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটিল এবং সে হস্তে চাবুক তুলিয়া লইল।
নিৎসে সহসা সেই হাউকাউয়ের মধ্যে আসিয়া রাগে ফুঁসিতে থাকা গাড়োয়ান কর্তৃক কোনও পশু নিপীড়নের দৃশ্য থেইকা পবিত্র মানবজাতিরে রক্ষা করিলেন। সুনিপুণ পোক্ত গোঁফওয়ালা নিৎসে আচমকা ঘোড়ার গাড়িতে লাফাইয়া উঠিলেন আর ঘোড়াটার গলা জড়াজড়ি দিয়া হাউমাউ শুরু করিয়া দিলেন। পরে তাঁহার পড়শী তাঁহারে বাড়িতে লইয়া গেল। অস্ফুট স্বরে শেষ অমোঘ বাক্য –‘আম্মা, আমি বেকুব’ উচ্চারিবার আগ পর্যন্ত তিনি নড়াচড়াছাড়া চুপচাপ দুই দিন একটা ডিভানে শুইয়া আছিলেন। এবং এরপর আরো দশ বৎসর তিনি মাতা ও ভগিনীদের দেখভালেই, নিরবে উস্কুখুস্কু বাঁচিয়া ছিলেন।
ঘোড়াটার কী হইল আমরা তাহা জানিতে পারি নাই। এমতি বিষণ্ণ ডায়ালগ এবং একখান অতিকায় কুৎসিত ঘোড়ার দৌড় (যা থামিতে দর্শকেরও ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনা থাকে)- এর মধ্য দিয়া যে সিনেমার শুরু তাহা কোথায় যাইয়া পর্দা নামাইবে ইহা সিনেমাখানি দর্শন-পূর্বক অনুমান করিলে নেহায়েত ভুল হইবে। তো, ভুল শুধরাইবার পূর্বে ‘দ্য তুরিন হর্স’ নামক সিনেমাটার খোদারে নিয়া দু’চার কথা পাড়িলে পাপ কিসে? পাপ এড়াইতে পাঠক জানিয়া রাখিবেন, সিনেমার নির্মাতা ওই খোদার নাম বিলা টার।
থিয়েটারকর্মী দম্পতির সন্তান বিলা টারের জন্ম ২১ জুলাই ১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির ম্যাকসেক পর্বতমালার ঢালে অবস্থিত পিকচ শহরে, কিন্তু তালেব হইয়াছেন রাজধানী বুদাপেস্টে। ১৬ বৎসর বয়সে তিনি সিনেমার ব্যাপারে নিজের আগ্রহের কথা বুঝিতে পারিলেন, তখন তিনি হাঙ্গেরির শহুরে শ্রমিক এবং গরিবের ওপর অ-পরিপক্ক ডকুমেন্টারি তৈয়ারিতে ব্যস্ত। এই পর্বের এক পর্যায়ে ‘এইট এম.এম’ নামে এক স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা নির্মাণের পুরস্কার হিসেবে হাঙ্গেরির সরকার তাঁহারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িবার অনুমতি দেয় নাই বলিয়া, তিনি সিরিয়াসলি সিনেমার কলকব্জা নাড়া শুরু করিয়াছিলেন।
পরবর্তীতে কাঁচা হাতের এসব ডকুমেন্টরিগুলানই তাঁহাকে বিখ্যাত ‘বিলা ব্যালজস স্টুডিও’ এর নজরে পড়িতে সাহায্য করে। এরপর, তিনি মাত্র ২২ বৎসর বয়েসে নিজের প্রথম ফিচার সিনেমা ‘ফ্যামেলি নেস্ট’(১৯৭৭)-এর জন্ম দেন। এসময় তিনি পড়শুনা শুরু করিলেন ‘হাঙ্গেরিয়ান স্কুল অফ থিয়েট্রিকাল অ্যান্ড সিনেমাটিক আর্টস’-এ। ১৯৮০ সন নাগাদ জন্ম দেন আরো দু’খানি সিনেমার, যার নাম যথাক্রমে ‘দ্য আউটসাইডার’ এবং ‘দ্য প্রিফাব পিপল’। ১৯৮২ সালে শেক্সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’-এর টেলিভিশন অভিযোজনের জন্ম দেন মাত্র দুইখানা শটে, প্রথম শট সিনেমা টাইটেলের পূর্বের ৫ মিনিট এবং দ্বিতীয় শট পরবর্তী ৬৭ মিনিট।
১৯৮৫ সালের ‘অটাম অলম্যানাক’-এর ৩ বৎসর পর বিলা টার হাঙ্গেরিয়ান লেখক লাজলো ক্রজনোহরকয়ির হাতে হাত মিলাইয়া লিখিলেন ‘ড্যামনেশন’(১৯৮৮)। সাত বৎসরের বোঝাপোড়ার পর বন্ধু লাজলোর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘স্যাটানটেঙ্গো’(১৯৯৪)-এর পরিকল্পিত অভিযোজনের মধ্য দিয়া ৪১৫ মিনিটের সিনেমা বানাইয়া রীতিমতো শোরগোল ফেলিয়া দেন। ‘জার্নি অন দ্য প্লেইন’(১৯৯৫) নামক ৩৫ মিনিটের সিনেমা নির্মাণের পর পাঁচ বৎসর চুপচাপ থাকিলেন বিলা টার, এরপর ২০০০ সন নাগাদ ছাড়িলেন ‘ওইয়েকমিস্টার হারমোনিস’। বেলজিয়ান লেখক জর্জ সিমেননের উপন্যাস ‘অ্যা ম্যান ফ্রম লন্ডন’ অবলম্বনে সৃষ্টি করিলেন ‘অ্যা ম্যান ফ্রম লন্ডন’(২০০৮)।
আদতে ইহা ২০০৫ সালের ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ প্রদর্শিত হইবার কথা আছিল, কিন্তু একই বৎসরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ আরিখে প্রডিউসার হামবাট্ বালসানের আত্মহত্যার কারণে কাজ থামিয়া যায়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ প্রদর্শিত হয় এবং ব্যাপক আকারে ক্রিটিকদের জবান আটকাইয়া দেন। ২০১১ সালে বাজারে ছাড়িলেন ‘দ্যা তুরিন হর্স’ সিনেমাটি। যেই বেত্তমিজ ঘোড়ার কারণে দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎসের মানসিক ভাঙ্গন ধরে বলে গুঞ্জন আছিল সেই ঘোড়া, তার মালিক এবং মালিকের মাইয়ারে নিয়া গল্প ফাঁদেন পুরানা বন্ধু লাজলোর লগে এবং মাত্র ৩০ শটে ১৪৬ মিনিটের সিনেমা বানাইয়া তাক লাগাইয়া দেন সিনেমাবোদ্ধাদের।
আদতে এই ঘোড়ার কী হইছিল এই কৌতূহল তাগো মাথায় দানা বাঁধে ১৯৮০ সনের মাঝামাঝি নাগাদ। পরবর্তীতে ১৯৯০ সনে দুই বন্ধু মিলিয়া সেই কৌতূহলরে সিনোপসিসে রূপ দেন। তখন ‘স্যাটানটেঙ্গো’-এর কাজ করিতেছিলেন বিধায় ইহা আর করা হইয়া উঠে নাই। এরও ১৮ বৎসর পর ২০০৮ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৫ দিনে বিলা টার নিয়মিত ক্যামেরাচালক ফ্রেড কেলেম্যানরের সাথে নিজের শেষ মাস্টারপিসের কাজ শেষ করেন। ২০১১ সালে এই সিনেমা বাজারে আসিবার পর বিলা টার আর সিনেমা বানাইবেন না বলিয়া ঘোষণা দেন।
তো, অন্য দশ জন থিকা, এহেন বিল টাররে আলাদা করিয়া দেখিবার কারণ আছে বৈকি। এই কারণ নিশ্চিতভাবে তাঁহার সিনেমার অন্দরে এবং সিনেমা নিয়া তার যাপিত জীবনেও তাকে অন্যদের থেইকা অনন্য করিয়া তুলিয়াছে। তাঁর সিনেমায় ঘটনা ঘটে কম, কথা কম কাজ বেশি। দৃশ্যের ইমোশন স্বভাবগত অতি ক্লোজ-আপ, মিড কিংবা অতিকায় লং শটে ক্যামেরায় বাঁধিয়া দর্শকের অন্দরমহলে বিনা কথায় প্রবেশ করিতে পারিলে বেশি কথা কইবার যুক্তি কোথায়? তথাপি সরল গল্পের ফাঁদে ফেলিয়া দর্শকরে গভীর থিকা গভীরে লইতে লইতে এমন এক আবহ সৃষ্টি করিয়াছেন যাহা আবার উপসংহারে সিধা ভূমিতে তুলিয়া দেয়। ক্যামেরার কোণা পরিবর্তনের সহিত দৃশ্যের ভাবগত পরিবর্তন তিনি একই সূতায় বাঁধিয়াছেন। তাঁহার সিনেমা দেখা বিনি, এসব নিয়া এতো গাল পাড়িয়া লাভ নাই। লোকে তাঁহারে রাশিয়ান কিংবদন্তী নির্মাতা আন্দ্রেই তারকোভস্কির লগে তুলনা দেয়, কিন্তু তিনি শুদ্ধ স্বীকার করিতেছেন তাঁহার আদর্শ আরেক জার্মান নির্মাতা রেইনা ওয়ারনার ফাসবাইন্ডার। ইহকাল জুড়িয়া শুধুমাত্র সাদা-কালো সিনেমা নির্মাণ করিয়া বর্তমানে তিনি সিনেমা তত্ত্বর আলোচনা এবং সিনেমার শিক্ষক হিসাবে জারি রহিয়াছেন ইউরোপে।
মার্কিন দেশের ফিল্ম-ক্রিটিক, সাংবাদিক, লেখক সুজান সনটাগ বিলা টাররে আধুনিক সিনেমার ত্রাণকর্তা হিসেবে পাঠ এবং প্রচার করিয়াছেন। ২০১১ সালে তিনি ‘সিনে ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর নিয়ন্তাদের সমিতিতে যোগদান করেন। ২০১২ সালে ‘বি.আই.এ.এফ.এফ স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড ফর লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’, ‘বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ ‘জুরি গ্র্যান্ড প্রিক্স’ সহ নানা বিবিধ সম্মাননা পাইয়াছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/একে/এসজে








