আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো মামলায় সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
ফাইল ছবি
আশুলিয়ায় জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সাতজনকে হত্যা এবং ছয় মরদেহসহ একজন জীবিত ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই রায়ে সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, দুইজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে ক্ষমা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি তৃতীয় রায় এবং ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ঘোষিত প্রথম রায় হিসেবে বিচার বিভাগে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছে।
এদিন বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে গ্রেফতার আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই সংক্ষিপ্ত রায় পাঠ করেন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। পরে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু হয়। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এবং প্রধান প্রসিকিউটরের সংযোগ থেকেও তা দেখানো হয়।
মামলার ১৬ আসামির মধ্যে গ্রেফতার হওয়া আটজন হলেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক এবং কনস্টেবল মুকুল। সকালে প্রিজনভ্যানে করে তাদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।
আরও পড়ুন: নাহিদের রিট খারিজ, ঢাকা-১১ আসনে কাইয়ুমের নির্বাচনে বাধা নেই
অন্যদিকে পলাতক আট আসামি হলেন ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অভিযান) নির্মল কুমার দাস, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত হন। পরে তাঁদের মরদেহ ভ্যানে স্তূপ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ট্রাইব্যুনাল বর্বর ও অমানবিক অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়োজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক এবং মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম।
প্রসিকিউশন গত বছরের ২ জুলাই ১৬ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্যসূত্র, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভ জমা দেওয়া হয়, যা আদালত আমলে নেয়। পরে ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সে সময় উপস্থিত আট আসামির সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও এসআই শেখ আবজালুল হক দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি শেষ হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। মোট ২২ কার্যদিবসে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ ২৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
এরপর আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন আরাফাত হোসেন। গত ১৪ জানুয়ারি প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে এবং আসামিপক্ষের পাল্টা যুক্তি খণ্ডনের মাধ্যমে ২০ জানুয়ারি শুনানি শেষ হয়। ওই দিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ০১ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার জন্য ০৫ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে বলা হয়, এ ধরনের নিষ্ঠুর ও অমানবিক অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাই আইনের মূল লক্ষ্য। প্রসিকিউশনের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে শহীদদের পরিবার এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। নিহতদের স্বজনরা পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








