News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৯, ৭ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ১২:১৫, ৮ অক্টোবর ২০২০

‘আই হ্যাভ নো মানি বাট আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি’

‘আই হ্যাভ নো মানি বাট আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি’

দুপুর দুটা। এই মধ্যদুপুরে আজ দোহায় প্রখর রোদের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া। এই বাড়তি গরমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হৈ চৈ করে হোটেলে চিংড়িভর্তা আর শিং মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি নাজমা স্টপেজে, ফিরবো নিজের বাসায়।

বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর এক পাঠান বুড়ো গাড়ি থামালেন। ভাড়া ঠিক করে তাতেই চড়ে রওয়ানা হলাম। সাধারণত বিদেশের মাটিতে, এই দোহায় কোনো প্রবীণকে পেলে আমি জিজ্ঞেস করি, দোহায় তার কত বছর হলো!

এই বয়োবৃদ্ধ পাঠানের কাছেও তা জানতে চাইলাম। জবাবে বুড়ো মিয়া বললেন, “বেটা, ও কথা জিজ্ঞেস করো না।”

আমি বললাম, “আমার জানার ইচ্ছা, অনুগ্রহ করে আপনি বলুন।”

আমার আগ্রহকে সম্মান দিয়ে তিনি বললেন, “এই দোহায় আমার আজ ৪৮ বছর চলছে। আর দু বছর পর ৫০ বছর পূর্ণ হবে।”

এরপর শুরু হলো তার জীবনযুদ্ধের নানা গল্প। পাকিস্তানের পেশোয়ারে বাড়ি। নাম মোহাম্মদ সাজেদ। প্রায় ৩০ বছর তিনি ইউরোপিয়ান একটি নির্মাণ কোম্পানির ক্রেন, বুলডোজারসহ ভারী যানবাহন চালিয়েছেন। কোম্পানির কাছে তার পরিচিতি ছিল ‘ডেঞ্জারম্যান’ নামে। যে কোনো কঠিন কিংবা ভারী কাজ এলেই ডাক পড়তো তার।

এখন তার বয়স ৬৭ বছর। শরীরে কুলোয় না বলে নিজের গাড়ি যাত্রী আনা-নেয়া করে জীবীকা নির্বাহ করছেন। দিনে কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যা হয়, তাতেই তার দিন বেশ ভালো চলে যায়।

জিজ্ঞেস করলাম, ৪৮ বছরের সঞ্চয় দিয়ে পাকিস্তানে কী কী গড়েছেন?

তার সরল উত্তর, “কিছুই না। জীবনভর যা কামাই করেছি, মা-বাবাকে দিয়েছি, পাঁচ ভাইবোনকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।”

বেশ ভালো ইংরেজি জানা এই পাঠান আমাকে কথার শেষে বললেন, “আই হ্যাভ নো মানি, বাট আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি, আই হ্যাভ এ স্যাটিসফাইড হার্ট, আলহামদুলিল্লাহ।”

নিজের ভাইদের তিনি লালন পালন করেছেন, কাতারে এনেছেন। আজ তারা সবাই ধনী। কিন্তু এখন তাঁর প্রতি তাদের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। অথচ এটি নিয়েও এই পাঠানের কোনো আক্ষেপ নেই। এ প্রসঙ্গে তার নিস্পৃহ বয়ান, “আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। তাদের কাছ থেকে নেয়ার জন্য নয়। কাল কিয়ামতে আমি ভারমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে দেখা করবো, এটাই আমার ইচ্ছা।”

পাঠানদের সরলতা বা নির্বুদ্ধিতা নিয়ে অনেক কৌতুক-গল্প প্রচলিত আছে। কিন্তু এখানে সাজিদ সাহেবের কাছে পেলাম দিলওয়ালা আর দিলখোলা পাঠানের পরিচয়।

ফেরার পথে তিনি এক জায়গায় গাড়ি থামালেন। বললেন, “এখানে পথচারীদের জন্য ফ্রি ঠাণ্ডা শরবত রাখা থাকে।” উর্দুতে বললেন, “চালো, পি লে।”

সাজিদ সাহেব নিজেই আমার জন্য মগ ভর্তি করে নিয়ে এলেন প্রাণ জুড়ানো ঠাণ্ডা পানীয়। এবার ফ্রি শরবতের ইতিহাস বললেন, “এক কাতারি ক্যান্সারে ভুগে মৃত্যুর আগে তার ছেলেদের অসিয়ত করে যান, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা যেন এখানে পানীয় ও শরবত রাখা থাকে।”

তাকিয়ে দেখি, ফ্রিজের ওপর লেখা, “আপনার যা প্রয়োজন নিয়ে নিন”।

গন্তব্যে পৌঁছে গেল গাড়ি। আমার মতো মুগ্ধকর মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে ভাড়া নিতে তিনি অস্বীকার করলেন দিলখোলা পাঠান। আমি জোর করেই তা দিলাম। গাড়ি থেকে নামতে নামতে কানে বাজলো আমার জন্য তার প্রার্থনা, “খোশ রাহো বেটা।”

এই খোশদিল পাঠানের কিছুক্ষণ সঙ্গ আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল, “সম্পদে নয়, সুখ লুকিয়ে থাকে অন্য কিছুতে। সেটি খুঁজে নিতে হয়।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/একে

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়