নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:০৭, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ১৫:০৯, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’

২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) উদ্যোগে আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০২৭ শিক্ষাবর্ষ) নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যপুস্তকে নতুন অধ্যায় হিসেবে সংযোজিত হতে যাচ্ছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত ও ঐতিহাসিক নিবন্ধ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি। একই সঙ্গে নিবন্ধটির পাশাপাশি তাঁর তৎকালীন ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির দুর্লভ ছবিও বইটিতে যুক্ত করা হচ্ছে।

গত ২৪ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা গণমাধ্যমকে জানান, আগামী বছরের শিক্ষাবর্ষ থেকেই নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি সর্বসম্মতভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যার যতটুকু অবদান রয়েছে, তা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংকীর্ণতা বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরতেই বর্তমান সরকার এই সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এনসিসিসি সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের নতুন প্রজন্ম কোনো ধরনের রাখঢাক বা একপাক্ষিক বয়ান ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।

এনসিটিবির কারিকুলাম-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিতি অংশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তাঁকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম হিসেবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাশাপাশি, এই গদ্যের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব হিসেবে না দেখে একে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রবন্ধের সূচনায় কিছু বিশেষ ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি জাতির জন্ম এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধ দুটিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ব্যাখ্যায় আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক কৃতিত্বের ফসল নয়। এই দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অনিবার্য ও অপরিহার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই গদ্যের মূল বর্ণনায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের এক অনন্য আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ২০২৭ থেকে নতুন শিক্ষা, ২০২৮-এ বড় সংস্কার

মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতির কথা স্মরণ করে জিয়াউর রহমান নিবন্ধে লিখেছেন, “সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি। নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো... ২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এল। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম।”

নিবন্ধে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যময় গতিবিধি এবং ১৩ মার্চ পাকিস্তানি জেনারেলদের একের পর এক বিমানে আসার মধ্য দিয়ে সংঘটিত পাক বাহিনীর গোপন ষড়যন্ত্রের নিখুঁত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। পঁচিশ ও ছাব্বিশের সেই ভয়াল রাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি উল্লেখ করেন, আগ্রাবাদের ব্যারিকেডের সামনে মেজর খালিকুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর যখন জানা যায় পাকিস্তানি বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট ও শহরে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, তখন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—“উই রিভোল্ট” বা আমরা বিদ্রোহ করলাম।

ষোলোশহর সেনানিবাসে ফিরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের অফিসার ও জোয়ানদের একত্রিত করে সংক্ষিপ্ত ভাষণে যখন তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধের ঘোষণা দেন, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ২টা ১৫ মিনিট তারিখ ২৬শে মার্চ ১৯৭১। এরপর পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রা এবং ইপিআর সদস্যদের নিয়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন ও সামরিক কৌশলের মাধ্যমে পাকিস্তানি শিবিরে প্রথম সম্মুখসমর ও তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধনের বিশদ বিবরণ এতে স্থান পেয়েছে।

বিশেষ করে ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ... সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম—স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছি, সে কথাও লেখা হলো সেই প্রথম ঘোষণায়... বেতার তরঙ্গের সে ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা ল্পল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনল: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ২৭শে মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়ে গেল স্বাধীন বাংলাদেশ কথাটি। সে ছিল সত্যি এক অলৌকিক ব্যাপার!”

এনসিটিবির এই সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগকে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাধুবাদযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়ে মত প্রকাশ করে বলেন, জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধটির রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক মূল্য ও প্রামাণ্য দলিলস্বরূপ তাৎপর্য। এর মাধ্যমে দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার সঠিক সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন ও ওয়াকিবহাল হতে পারবে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. শাহ শামীম আহমেদ মনে করেন, অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যেভাবে একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের এই নির্মোহ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি সেই সংকীর্ণ মানসিকতার স্থায়ী অবসান ঘটাবে। এই নিবন্ধ পাঠের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস জানার এক সুবর্ণ সুযোগ লাভ করবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়