মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি আর চলবে না: শিক্ষামন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, শুধু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। নিজেদের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার ঠিক করে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, শুধু মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করা আর চলবে না। ট্রিগার আমিও টানতে জানি।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি ও ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ভাইস-চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২ হাজার ৩০৭ থেকে আড়াই হাজার কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং সার্বিক তদারকি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির অধীন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও এর বর্তমান মান ও প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কোন কলেজে কী পড়ানো হচ্ছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে তা নিয়মিত তদারকি করা জরুরি। এই মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে শ্রেণিকক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে পাঠদান ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালুর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন অনিয়মের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে যেখানে মাত্র এক বা দুজন শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও সন্তোষজনক নয়, অথচ এসব তথ্য দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে জানানো হয়নি। বাজারের চাহিদাভিত্তিক আধুনিক কোর্স চালু, কারিকুলাম সময়োপযোগী করা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
আরও পড়ুন: ২৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, মিলবে টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষার ফল প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে পরীক্ষকদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ড. এহসানুল হক মিলন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক পুনর্নিরীক্ষায় নতুন করে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক খাতা মূল্যায়নে ত্রুটি বা গাফিলতির প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, যেসব পরীক্ষক খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
পাশাপাশি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন পদ্ধতিতেও আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, শতভাগ শিক্ষক দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করালে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্নের মধ্যে মিল পাওয়া যায়, যা গাইড ও নোটবইয়ের সঙ্গেও মিলে যায়। এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রশ্ন প্রণয়নের কথা ভাবার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ল কোর্সের ফরম ফিলাপের ফি দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ অর্থ উপার্জন বা মুনাফা বৃদ্ধি করা নয়। টাকার এমন অপ্রয়োজনীয় চাহিদার পেছনে যৌক্তিকতা কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দুই শতাংশের বেশি। তবে শুধু বড় বাজেট পাওয়াটাই মূল কথা নয়, প্রাপ্ত প্রতিটি টাকা ও পয়সার সঠিক ও সৎ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতের অতিরিক্ত ব্যয়ের সমালোচনা করে তিনি উদাহরণ দেন যে, অতীতে রবীন্দ্রভারতীতে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জন্মবার্ষিকী উদযাপনেই ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ অন্যদিকে ল্যাবরেটরি ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের মতো অতি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর বলে শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন এবং মন্ত্রীর অনুপস্থিতির পাঁচ দিনের মধ্যেও শিক্ষা খাত নিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। সরকারের মূল লক্ষ্য কেবল কথার ফুলঝুরি ছড়ানো নয়, বরং শিক্ষাকে কর্মমুখী করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করা।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অভিশাপ সেশনজট পুরোপুরি দূর করার জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ ও শিক্ষামন্ত্রী। একইসঙ্গে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানানো হয়। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, সুনির্দিষ্ট সমন্বয় এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম সেরা ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








