নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৫৯, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি বিতর্কের পর এবার গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি বিতর্কের পর এবার গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদের মধ্যেই এবার সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতা নিক্ষেপের একটি ছবি সাঁটানো হয়েছে। জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঠিক পরপরই ঘটা এই আকস্মিক ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ গোটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূলত ডাকসু সংগ্রহশালার সংস্কার ও পুনর্চালনাকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালা পুনরায় চালু করা হলে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গ্যালারিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অভিযোগ ওঠে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার সংগ্রামের ছবি সঠিকভাবে স্থান না পেলেও সেখানে জিন্নাহর একাধিক ছবি ঠাঁই পেয়েছে। এই বিষয়টি জানাজানি হলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে মূল নেতৃত্বদানকারী শক্তির ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সমান্তরালে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতীকী উপস্থিতি দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। এই বিতর্কের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে। ওই দিন দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত দুটি ফ্রেম ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ঠিক এর রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার দুপুরে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীদের নিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় হাজির হন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী অর্ক বড়ুয়া। জিন্নাহর ছবি সরিয়ে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলার সেই শূন্য জায়গাতেই তারা ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম গোলাম আযমের জুতাপেটার একটি ঐতিহাসিক ছবি সাঁটিয়ে দেন।

সংগ্রহশালায় টাঙানো ওই ছবিটির নিচে ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমে ফিলিস্তিনের যুদ্ধে শহীদ দুই বাংলাদেশির জানাজার নামাজ পড়তে এলে উপস্থিত মুসল্লিরা তাকে জুতাপেটা করেন।

আরও পড়ুন: ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন গোলাম আযম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার তীব্র বিরোধিতা করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও তিনি বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের বিরুদ্ধে তদবির চালিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সাজা ভোগরত অবস্থায় ২০১৪ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

অন্যদিকে, ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ফিলিস্তিনের যুদ্ধে নিহত দুই বাংলাদেশির জানাজায় অংশ নিতে গেলে সাধারণ মুসল্লি ও আপামর জনতা গোলাম আযমকে ধাওয়া করে জুতাপেটা করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ডাকসুর সংগ্রহশালায় এই ছবি সাঁটানোর বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ছাত্রনেতা অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসু কারো বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। নাইনটিন এইটটি ওয়ানে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমের ওপর মানুষের যে ঘৃণা ও জুতা নিক্ষেপ ছিল, সেটিও তো আমাদের দেশের ইতিহাসেরই অংশ। যখন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে জিন্নাহর ছবি লাগাতে পারেন, তখন আমাদেরও ইচ্ছা হয়েছে গোলাম আযমের এই ঐতিহাসিক জুতা খাওয়ার ছবিটি এখানে প্রদর্শনের। আমরা এদেশের আপামর মানুষের সেই ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ইতিহাসই সংরক্ষণ করেছি।

এই পুরো কর্মসূচিতে ছাত্র ফেডারেশনের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাবি ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সাকিবুর রনি, অর্থ সম্পাদক উসাইন মারমা, রাজনৈতিক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ফোরকান আফ্রাদ এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক আহমেদ মাসুমসহ অন্যান্যরা। ছবি সাঁটানোর সময় সেখানে উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীরাও হাততালি দিয়ে এই পদক্ষেপে সমর্থন জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, ডাকসুর মতো একটি ঐতিহাসিক এবং পবিত্র ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালাকে ঘিরে এই পাল্টাপাল্টি ছবি লাগানো ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রমাণ করে যে জুলাই-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াই এবং ইতিহাসের সঠিক উপস্থাপন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র সংবেদনশীলতা কাজ করছে। একাত্তরের ঘাতক এবং পাকিস্তানপন্থীদের ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের এই তাৎক্ষণিক ও জোরালো প্রতিবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ভবিষ্যতে এ ধরনের স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়