আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:১১, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৪ ঘণ্টায় হুতিদের ওপর সৌদির ৫৪ বিমান হামলা

২৪ ঘণ্টায় হুতিদের ওপর সৌদির ৫৪ বিমান হামলা

ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী লড়াই আবারও নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। দেশটির পশ্চিম উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে হুতি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সর্বাত্মক উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের জেরে ভেঙে পড়েছে বিগত বছরগুলোতে চলে আসা তুলনামূলক স্থিতাবস্থা, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছাপিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকেও চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমানবাহিনী। সৌদি ঘাঁটি থেকে এফ-১৫ এবং টাইফুন যুদ্ধবিমানের সহায়তায় লাহিজ, তাইজ, আল-জাওফ, মারিব ও হাজ্জাহ প্রদেশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে অন্তত ৫৪টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাইজের খাদির জেলার একটি সরকারি কমপ্লেক্স এবং মাকবানাহ ও ধুবাব এলাকায় এসব হামলায় দুই শিশুসহ কমপক্ষে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে হুতিপন্থি গণমাধ্যমের দাবি।

এর আগে সৌদি আরব দাবি করেছিল যে, হুতিদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতটি আবাসিক বাড়ি ও বেশ কিছু যানবাহন। এই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্বশীল ও দৃঢ় জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি জোট ও তাদের সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী এই বিমান ও স্থল অভিযান পরিচালনা করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

সৌদি বিমান হামলার তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে হুতিরা জানিয়েছে যে, তারা দক্ষিণ সৌদি আরবের খামিস মুশাইতের কৌশলগত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে এবং কিং ফাহদ বিমানঘাঁটিতে ডজন ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। হুতি সূত্রের দাবি, ওই বিমানঘাঁটিগুলোর হ্যাঙ্গার, অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে এবং গোলাবারুদের প্রধান মজুতস্থলগুলো সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। 

গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয় যে, সাম্প্রতিক পাঁচ দিনের ব্যবধানে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ইয়েমেনের অভ্যন্তরে তিন শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে, যার জেরে এই রক্তক্ষয়ী পাল্টা আক্রমণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এসব পাল্টাপাল্টি দাবির সত্যতা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন: মক্কা-জেদ্দা-তায়েফে সৌদির জরুরি সতর্কতা

সংঘাতের এই তীব্রতার নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতি বাহিনীর বিদ্যুৎগতির সামরিক অগ্রগতি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটিয়ে হুতিরা লোহিত সাগরের পুরো উপকূলীয় রেখা, কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা (Mocha), আল খাউখাহ এবং হেইস জেলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত কৌশলগত মায়ুন দ্বীপ (পেরিম দ্বীপ) এবং দক্ষিণ লোহিত সাগরের গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে হুতিরা। এই দ্রুতগতির আগ্রাসনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সামরিক মানচিত্রে হুতিদের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং লোহিত সাগর উপকূল কেবল ইয়েমেনের স্থানীয় যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি পরিবহনের বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল ধমনী। হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ যখন ইতিমধ্যে ব্যাহত হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং রুট এবং তেলের বাজার নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অর্জিত যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘদিনের তুলনামূলক স্থিতাবস্থা গত জুলাই মাস থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কার্যকর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকার ও সৌদি জোট এই অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করায় পুরো অঞ্চলটি এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়