বিদেশি প্রতারকদের সাইবার চক্রের গোপন নেটওয়ার্ক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার
গ্রেফতার বিদেশি নাগরিকেরা। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের নিরাপদ থাবা এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন ও অভিজাত এলাকায়। চীন, লাওস, পাকিস্তান, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাইবার অপরাধীরা নিজ দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানের মুখে পড়ে বাংলাদেশকেই তাদের নতুন অপারেশনাল হাব বা হটজোন হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুই অঞ্চল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আবাসিক ভবন, হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের গোপন কর্মকাণ্ড চালানোর যে চিত্র সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে সামনে এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এবং কক্সবাজারের রামুর হিমছড়িতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিভাইস ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষসহ শতধিক বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতারের ঘটনা এই উদ্বেগজনক বাস্তবতাই ফুটিয়ে তুলেছে। দেশের ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসের ব্যাপক বিস্তার এবং সাইবার অপরাধ দমনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের তৎপরতা এখন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত খুলশীতে একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট দেড় মাস ধরে ভাড়া নিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের অবস্থান, বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন-ল্যাপটপ-সার্ভার এবং অন্যদিকে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন একাধিক রিসোর্টে আড়াই থেকে তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকের অবস্থান, কম্পিউটার ল্যাব, ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ এবং প্রায় দুই হাজার আইফোন উদ্ধারের ঘটনা একই ধরনের একটি বড় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তারের প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি বলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের খুলশীর ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ও পরদিন অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচজন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জন নারী এবং একজন শিশু রয়েছে। অভিযানে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ প্রায় ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। আটতলা ভবনটির ১৪টি ফ্ল্যাটেই তাদের অবস্থান ছিল এবং সেখানে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযানের পর পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক কীভাবে একই ভবনের প্রায় সব ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেন এবং তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ, আবাসন ও কর্মকাণ্ডের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় একটি চক্রের সহায়তায় ওই বিদেশিরা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন।
কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন, মহসীন নামে এক বাংলাদেশি তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তারা জুনে দেশে এসে প্রথমে ঢাকায় প্রায় দুই দিন অবস্থান করেন, পরে চট্টগ্রামে যান। তাদের পাসপোর্ট ওই ব্যক্তির কাছে রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনো ওই মহসীনের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করেনি। তাকে আইনের আওতায় আনতে পারলে বিদেশি চক্রটির বাংলাদেশে প্রবেশ, অর্থায়ন, আবাসন ও কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
চট্টগ্রামের ওই ৬৩ জনের ক্ষেত্রে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি এবং অনেকেই নিজ দেশের ভাষা ছাড়া ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা বুঝতে পারেন না বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পথ, ভিসার ধরন, পেশাগত পরিচয় এবং অনলাইন কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং দোভাষীর সহায়তায় জিজ্ঞাসাবাদ ও জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত অনলাইন প্রতারণার অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া গেলেও তারা ঠিক কোন ধরনের স্ক্যাম পরিচালনা করতেন, তা ফরেনসিক বিশ্লেষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে চট্টগ্রামে বিদেশিদের এমন সমাবেশকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না পুলিশ। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানিয়েছেন, চীন, লাওস, কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশে অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কঠোর অভিযানের কারণে সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা নতুন অপারেশনাল অবস্থান খুঁজছে এমন তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের তুলনামূলক সহজলভ্য ইন্টারনেট, ব্যাপক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সাইবার অপরাধ শনাক্ত ও ফরেনসিক তদন্তের সীমাবদ্ধতাকে অপরাধীরা কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। তবে এই ধারণার সব দিক এখনো তদন্তাধীন।
কক্সবাজারের ঘটনাটি এই চিত্রকে আরও বড় পরিসরে সামনে এনেছে। রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টসহ মেরিন ড্রাইভ ও ইনানী এলাকার একাধিক আবাসিক স্থাপনায় চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের একটি বড় দল কয়েক মাস ধরে অবস্থান করছিল বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে প্রথম বড় অভিযান চালানোর পর সেখানে তৈরি করা কম্পিউটার ল্যাব থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস এবং ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিপুল সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। রিসোর্টের অন্য অংশে পাওয়া যায় ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ।
অভিযানের সময় সেখানে অবস্থানকারী অনেক বিদেশি পেছনের সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, শুধু মেরিনা বিচ ভিলা নয়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ও উখিয়ার ইনানী এলাকায় আরও কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে চক্রটির সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। পুলিশের মামলায় এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে আড়াই থেকে তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে চক্রটির ভাড়া নেওয়া ও পরিচয় গোপনের কৌশল নিয়ে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবর আলী নামে পরিচিত এক ব্যক্তি রিসোর্টগুলো ভাড়া নেন এবং নিজেকে বাংলাদেশে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে থাকা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। সংশ্লিষ্টদের কাছে জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও পুলিশের অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ চারজনকে পলাতক আসামি হিসেবে শনাক্ত করেছে জান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং এবং জিয়ান ঝাং।
আরও পড়ুন: কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
স্থানীয় পর্যায়ে চক্রটির চলাফেরার ধরনও ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। মেরিনা বিচ ভিলার কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশিদের ভাড়া নেওয়া কক্ষগুলোতে স্থানীয় কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না। তাদের যাতায়াত ছিল গোপনীয় এবং দৈনন্দিন কেনাকাটা ও অন্যান্য কাজের জন্য নিজেদের লোক ব্যবহার করতেন। এমনকি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনাতেও তাদের প্রভাব তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় কর্মীদের বক্তব্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য থেকে তদন্তকারীরা মনে করছেন, সাধারণ পর্যটক বা ব্যবসায়ী হিসেবে অবস্থান নেওয়ার আড়ালে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি একটি সংগঠিত কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
২৫ আগস্টের অভিযানের পরও চক্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং সদস্যরা বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়েন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে পাঁচ চীনা ও একজন তাইওয়ানি নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোনসহ কয়েক ডজন ল্যাপটপ ও অন্যান্য যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। পরে ছয়জনকেই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের মামলা হয়েছে। মামলায় আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে কক্সবাজারের চক্রটির প্রতারণার ধরন সম্পর্কেও কিছু ধারণা পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ভুয়া বা ক্লোন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, বিনিয়োগের প্রলোভন, ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ জমা নেওয়া এবং পরে এক্সিট ফ্রড-এর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, চক্রটি স্টারলিংক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া, শেয়ারবাজার ও বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল তবে জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর এসব কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন আরও স্পষ্ট হবে।
রিসোর্টে ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করা এবং বিপুলসংখ্যক পুরোনো মডেলের আইফোন একসঙ্গে রাখার বিষয়টি তদন্তকারীদের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, বিপুলসংখ্যক ফোন ও কম্পিউটার একসঙ্গে ব্যবহার করে একাধিক অনলাইন পরিচয়, অ্যাকাউন্ট বা যোগাযোগ চ্যানেল পরিচালনা করা হয়ে থাকতে পারে। সাউন্ডপ্রুফ কক্ষগুলোও গোপন ভয়েস কল, কল সেন্টারভিত্তিক প্রতারণা কিংবা পরিচয় গোপন রেখে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে তবে ডিভাইস ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
কক্সবাজারের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চক্রটির সদস্যরা ২০২৬ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন এবং এপ্রিল থেকে বিভিন্ন স্থাপনা ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। রিসোর্ট মালিকদের কাছে নিজেদের বৈধ ব্যবসায়িক পরিচয় তুলে ধরে তারা দীর্ঘমেয়াদি ভাড়ার ব্যবস্থা করেন। অথচ পরে দেখা যায়, কথিত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই এবং তাদের প্রকৃত কর্মকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমনকি রিসোর্টগুলোর স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর পরিবর্তন করে তারা নিজেদের লোকজন দিয়ে নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
দুই এলাকার ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি ঝুঁকির চিত্র স্পষ্ট হয়। একটি ঘটনায় অভিজাত আবাসিক এলাকার পুরো ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট ব্যবহার করে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে একসঙ্গে রাখা হয়েছে; অন্য ঘটনায় পর্যটন এলাকার একাধিক রিসোর্টে আড়াই থেকে তিন শতাধিক বিদেশির অবস্থানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রেই স্থানীয় সহযোগী, ভাড়া নেওয়া সম্পত্তি, বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং পরিচয় গোপন করার কৌশলের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে মহসীন নামে এক বাংলাদেশির সন্ধান যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি কক্সবাজারে বাবর আলীসহ কয়েকজনের ভূমিকা তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে। ফলে বিদেশিদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের বাংলাদেশে আনা, বাসা বা রিসোর্ট ভাড়া করে দেওয়া, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক লেনদেনে সহযোগিতা করা দেশীয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও এখন তদন্তের বড় অংশ।
বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাঁচ চীনা নাগরিকসহ আটজনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির সাইবার ইউনিট। তাদের কাছ থেকে ৫১ হাজারের বেশি সিম কার্ড, ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। আগস্টে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তিন চীনা নাগরিকসহ চারজনকে গ্রেফতার করে ডিবি; তাদের কাছ থেকে ৬ হাজারের বেশি সিম, ২০টি গেটওয়ে ডিভাইস ও ১৪টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছিল, ওই চক্র অনলাইন জুয়া, অবৈধ ভিওআইপি এবং ভুয়া চাকরি বা অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এসব ঘটনায় একটি সাধারণ প্যাটার্নও দেখা যাচ্ছে। অপরাধীরা শুধু প্রচলিত ফিশিং বা ভুয়া লটারি দিয়ে থেমে নেই; ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় তৈরি, চাকরি বা বিদেশে কাজের প্রলোভন, রোমান্স স্ক্যাম, হানিট্র্যাপ, ভুয়া ই-কমার্স সাইট, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নামে মেসেজ পাঠানো, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, পরিচয় চুরি এবং অনলাইন জুয়ার মতো একাধিক কৌশল ব্যবহার করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করে তা দ্রুত একাধিক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা এবং পরে ডিজিটাল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় এ ধরনের অর্থপাচার হয়েছে কি না, তা প্রমাণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আর্থিক ও ডিজিটাল তদন্ত প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক মো. শাখাওয়াত হোসেনের মতে, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ঘিরে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক বাজার সক্রিয় থাকলে তা আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদের ভাষ্য, বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে সাইবার প্রতারণার ঘটনা আগে থেকেই ছিল; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশি গ্রেফতার হচ্ছে।
তার মতে, বিদেশে বসে দেশি এজেন্ট ব্যবহার করেও কেউ কেউ বাংলাদেশে প্রতারণা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে বসে অপরাধ পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করলে, অপরাধে যুক্ত থাকলে কিংবা অপরাধ করে দেশত্যাগের চেষ্টা করলে গোয়েন্দা নজরদারি, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধীর জাতীয়তা নয়, অপরাধের প্রমাণই আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি এমন অবস্থানই পুলিশের।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকজন বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের সম্ভাব্য নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠার বিষয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র, অভিজাত আবাসিক এলাকা ও স্বল্পসময়ে বড় পরিসরের আবাসন ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা নজরদারির আওতায় আনা, বিদেশি নাগরিকদের আবাসন ও কর্মপরিচয়ের তথ্য দ্রুত যাচাই, বাড়ি-হোটেল-রিসোর্ট ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা, সন্দেহজনক বিপুলসংখ্যক ডিভাইসের ব্যবহার শনাক্ত করা এবং স্থানীয় সহযোগীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, আর্থিক লেনদেনের পথ অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ছাড়া এই নেটওয়ার্কের প্রকৃত বিস্তার নির্ধারণ কঠিন।
চট্টগ্রামের ৬৩ বিদেশি এবং কক্সবাজারের ছয় গ্রেফতারের ঘটনা তদন্তের পরবর্তী ধাপেই সম্ভবত আরও বড় চিত্র সামনে আসবে। চট্টগ্রামে মহসীন কে, কীভাবে ৬৩ বিদেশিকে দেশে এনে আবাসনের ব্যবস্থা করা হলো, তাদের পাসপোর্ট কোথায় এবং তারা কোন ধরনের অনলাইন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন এসব প্রশ্নের উত্তর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কক্সবাজারে পলাতক ২৫০ থেকে ৩০০ জনের প্রকৃত পরিচয়, তাদের অবস্থান, অর্থের উৎস, কথিত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সত্যতা এবং রিসোর্টগুলোতে স্থাপিত প্রযুক্তি অবকাঠামোর প্রকৃত ব্যবহারও তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে বাংলাদেশে বিদেশি সাইবার অপরাধীদের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল, নাকি এর পেছনে আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








