ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা চিফ হুইপের
ছবি: সংগৃহীত
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। এসব চুক্তির কোনোটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করে শিগগিরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
তার ভাষ্য, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সরকার আগ্রহী হলেও সেই সম্পর্ক কোনোভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব বা মর্যাদার পরিপন্থী হতে দেওয়া হবে না।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি করা হয়েছে, সেগুলো এখন পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ধারা, ব্যবস্থা বা প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, বাতিল কিংবা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, সরকারের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তবে বন্ধুত্বের অর্থ দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের উদাহরণ দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, আগের সরকারের সময়ে এমন কিছু ব্যবস্থা ও চুক্তি করা হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ ও কোনো বন্ধুদেশের দুটি জাহাজ একই সময়ে বন্দরে এলে বন্ধুদেশের জাহাজকে আগে খালাস দেওয়ার মতো অগ্রাধিকার রাখা হয়েছিল।
এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থবিরোধী এমন অসংখ্য ব্যবস্থা ও চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা চুক্তি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথম বিবেচনায় রাখা হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিফ হুইপ সবার আগে বাংলাদেশ নীতির ওপর জোর দেন।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকের পরও তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী কোনো দেশকে উপেক্ষা করতে চায় না; তবে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও তিনি তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন ও প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময় বিবেচনা করেই সফরের সময় নির্ধারণ করা হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর প্রসঙ্গও সাম্প্রতিক সময়ে চিফ হুইপের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এর মধ্যে পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, কাঁটাতারের বেড়া এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষের কথা তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মাটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করার নীতির কথাও বলেছেন তিনি। ভারতেও যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আশ্রয় বা প্রশ্রয় না পান এ প্রত্যাশার কথাও তিনি এর আগে প্রকাশ করেন।
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণের বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নুরুল ইসলাম মনি। তার বক্তব্যে বিষয়টি বাংলাদেশের মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উঠে আসে। তবে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০২৬ সালের ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য পৃথক আমন্ত্রণও আগে দেওয়া হয়েছিল বলে ভারত জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পরিষ্কার করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং এ কারণে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ নেই। ব্রিকসের ২০২৬ সালের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রচলিত রীতির অংশ হিসেবে বিমসটেকের চেয়ারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে ভারতীয় পক্ষের ব্যাখ্যা রয়েছে।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নিয়েও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন চিফ হুইপ। ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন চলে মোট নয় কার্যদিবস। অধিবেশনে উত্থাপিত ছয়টি বিলই পাস হয়েছে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংসদীয় কার্যক্রমে বিভিন্ন নোটিশ, আলোচনা এবং সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের বিষয়ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ৪১ দেশে চালু হচ্ছে প্রবাসীদের এনআইডি সেবা
প্রকাশিত সংসদীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিবেশনে তিনটি বিশেষ কমিটিসহ ৪৮টির বেশি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
চিফ হুইপ জানান, অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এ ছাড়া ১২৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা এবং ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের তথ্যও তিনি তুলে ধরেন।
অধিবেশন শুরুর আগে চিফ হুইপ জানিয়েছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আইন, বিশেষ করে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইনের বিষয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, মা-বাবা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও তাঁদের জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার অবহেলা, বাড়িছাড়া বা সম্পদ ব্যবহারে বঞ্চিত হওয়ার মতো সামাজিক সমস্যা কমানো। এ বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের প্রসঙ্গে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন চিফ হুইপ।
তার দাবি, আইনটি প্রণয়নের আগে ১৬ জন রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন অংশীজন ও আইন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং আগের ব্যবস্থার তুলনায় নতুন আইনটি আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই করা হবে এবং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নেই এমন অভিযোগও নাকচ করেন চিফ হুইপ।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ২৬টিতে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতেও বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখার কথা জানান তিনি। এর আগে তৃতীয় অধিবেশন শুরুর আগে চিফ হুইপ বলেছিলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত পাঁচ মাসে শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ২০৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক রেজুলেশনের ১৮(ক) ধারা বাতিলসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, আগের সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমান সরকার আগের দায়মুক্তির ব্যবস্থা বাতিল করেছে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, নতুন করে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় প্রয়োজন। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে আগের সরকারের বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যয় নিয়ে সরকারের সমালোচনামূলক অবস্থানের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
দেশে সার সংকট নেই বলেও দাবি করেন চিফ হুইপ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন বেশি সার মজুদ রয়েছে। কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কৃষি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
সব মিলিয়ে তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নুরুল ইসলাম মনির বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলের বিভিন্ন চুক্তি ও নীতিগত সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা এবং দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের পরিবর্তন আনা। ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা শেষ হলে কোন কোন চুক্তিতে সংশোধন, বাতিল বা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন নজর কাড়ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সমতা, পারস্পরিক মর্যাদা ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার যে নীতি সরকার তুলে ধরছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন কীভাবে ঘটে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








