হাম ও উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ১১২০
ফাইল ছবি
দেশে ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নতুন তিন মৃত্যুর মধ্যে দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের একজন চট্টগ্রামের এবং অন্যজন নোয়াখালীর বাসিন্দা। অপর শিশুটির মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সর্বশেষ এই তিন মৃত্যুই হামের উপসর্গজনিত; নিশ্চিত হামে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। এর ফলে মোট মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৯১২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ১১১ জনের শরীরে হাম বা হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৭৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গযুক্ত রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮২২ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৬৭ জনের শরীরে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ মিলিয়ে এ সময়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮৯ জনে।
পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝা যায় হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানেও। ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬৪ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেও বিপুলসংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে নতুন রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালগুলোতে হাম-সন্দেহভাজন ও আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
এর আগের ২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তখন মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৯ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ এবং উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জন। একই সময়ে ১ হাজার ১৬৫ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ এবং ২৯ জনের মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়। ফলে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯৩৩। ওই সময় পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন এবং সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পান ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।
তার আগের দিন ৯ সেপ্টেম্বরও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে আসে। ওই ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যুতে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণহানি প্রথমবারের মতো এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২ জন। ওই দিন নতুন করে ১ হাজার ১১৯ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ এবং ৬৯ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছিল। তখন পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ এবং নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯০৪।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু
দেশে চলমান এই প্রাদুর্ভাবকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম ছিল। ৯ সেপ্টেম্বর হাম-সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়ানোর পর বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, গত প্রায় আট বছর ধরে দেশে বার্ষিক হাম সংক্রমণ ৪০০-এর নিচে ছিল এবং মৃত্যুও প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছিল; ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য এবং ২০২৬ সালে নির্মূলের সনদ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতির পেছনে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ও টিকাদানের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সংকট শুধু নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিপুলসংখ্যক রোগীর মধ্যে হামের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮২২ এবং নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারে পৌঁছানোয় সংক্রমণের বিস্তার কতটা ব্যাপক, তা স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের বিস্তার ও মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে ঢাকা বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই সময় পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিভাগেই ৭২ হাজার ৩৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ এবং ১২ হাজার ১৯৫ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছিল। সর্বশেষ কয়েক দিনের মৃত্যুর ঘটনাতেও ঢাকা বিভাগের পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ১০ সেপ্টেম্বরের সাত মৃত্যুর মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন এবং সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা যায়, যা প্রাদুর্ভাবটির ভৌগোলিক বিস্তৃতিও তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে ১ হাজার ১২ জনের মৃত্যু, ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮২২ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ এবং ১৯ হাজার ৯৬৭ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। একই সময়ে প্রায় দেড় লাখ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। তবে প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








