নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:০৩, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদানির ইউনিট বন্ধ ও জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র

আদানির ইউনিট বন্ধ ও জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র

ফাইল ছবি

কয়লা ও গ্যাস সংকটের মধ্যেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশে আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। সর্বশেষ ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকেই চলমান গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকট যুক্ত হওয়ায় বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে একাধিকবার এবং দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট করছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময় ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। বিকেল ৪টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৭টায় ৩ হাজার ২১ মেগাওয়াট। রাত ৯টার সন্ধ্যা পিকেও চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১২৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ১৪ হাজার ৪৩৯ মেগাওয়াট; অর্থাৎ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। রাত ১০টায়ও ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩৯৫ মেগাওয়াট।

আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়াই সর্বশেষ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পিজিসিবির আমদানি বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় আদানি থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে। রাত ১০টায়ও সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৪২৫ মেগাওয়াট এবং রাত ১১টায় ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট। এরপর মধ্যরাত থেকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। 

১০ সেপ্টেম্বর রাত ১টায় সরবরাহ নেমে আসে ৭৬১ মেগাওয়াটে এবং সকাল ৬টায় ছিল ৭৫৮ মেগাওয়াট। দিনের বেশির ভাগ সময় তা ৭৩০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটের আশপাশে ছিল। সন্ধ্যা ৭টায় আদানি থেকে এসেছে ৭৩৩ মেগাওয়াট এবং রাত ৯টায় মাত্র ৬৯১ মেগাওয়াট অর্থাৎ আগের দিনের একই সময়ের ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াটের তুলনায় কমেছে ৭৩৯ মেগাওয়াট, প্রায় অর্ধেকে।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ৯ সেপ্টেম্বর রাতে আদানি কেন্দ্রের উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের ওপরে ওঠার পর বয়লারে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। দুটি ইউনিটের মোট স্থাপিত ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট হওয়ায় একটি ইউনিট অচল হয়ে পড়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় নেমে আসে। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়লারের ত্রুটির পর ইউনিটটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে; এরপর মেরামতের কাজ শুরু হবে। ফলে পুরো সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে আদানি কেন্দ্রের সমস্যা একেবারে নতুন নয়। আগস্টের শুরু থেকেই কয়লা সরবরাহের সমস্যায় কেন্দ্রটির উৎপাদন কম ছিল। 

পিডিবি ও অন্যান্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণে আদানি কেন্দ্রটি সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিচ্ছিল। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ করা হচ্ছিল।

আদানি পাওয়ার অবশ্য ওই সময় বাংলাদেশে সরবরাহ কমার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক বা চুক্তিগত কোনো বিষয় নয়, কয়লা পরিবহনে রেলপথের সমস্যাকে সামনে এনেছিল। ২ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, রেলপথে অতিরিক্ত চাপ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কয়লা লোডিংয়ে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার রেক সময়মতো পৌঁছাতে পারছিল না। এতে কেন্দ্রটিতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম কয়লা পৌঁছাচ্ছিল এবং উৎপাদন সাময়িকভাবে সমন্বয় করতে হচ্ছিল।

কয়লা সরবরাহের সেই সংকট কাটিয়ে আগস্টের শেষ সপ্তাহে কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে। দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পিক আওয়ারে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের কৌশল নেওয়া হয়েছিল। ৯ সেপ্টেম্বর রাতে কেন্দ্রটির সরবরাহ আবার ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াটে ওঠে, যা প্রায় পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বয়লারের কারিগরি ত্রুটিতে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই পুনরুদ্ধার স্থায়ী হয়নি। পিজিসিবির তথ্যেও ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আদানি থেকে ১ হাজার ৪২৫ থেকে ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসার পর ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১টা থেকেই সরবরাহ ৭৬১ মেগাওয়াটের আশপাশে নেমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায়।

আদানির পাশাপাশি আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, হঠাৎ করে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছে এবং সেটি দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। একই সময়ে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একযোগে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন এই ঘাটতির সঙ্গে আগে থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকা সমস্যাগুলোও রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী

বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক সংকট অবশ্য শুধু আদানি ও আরএনপিএলের দুটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণে তৈরি হয়নি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, জ্বালানি সংকট ও কারিগরি সমস্যার কারণে দেশের ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং চালু থাকা অনেক কেন্দ্রও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছিল।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও একই সময়ে একাধিক সমস্যা ছিল। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ ছিল। বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রেরও উৎপাদনে কারিগরি সমস্যার প্রভাব পড়েছে। রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রগুলোতে কয়লার মজুত ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। আগস্টের শেষ দিকে পিডিবি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের আটটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও সেগুলো থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন হচ্ছিল।

গ্যাসের সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে আছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাসের অভাবে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস; কিন্তু সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলো তখন পাচ্ছিল প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। সংকটের সময়ে উচ্চ ব্যয়ের ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলেও আগস্টের শেষ দিকে ২৪টি কেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতির কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট সূত্র। ফলে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি পূরণে বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপরও প্রত্যাশিত মাত্রায় নির্ভর করা সম্ভব হয়নি।

এভাবে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিডে। ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭৭১ মেগাওয়াট। ওই সময় আদানি থেকে ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। পরদিন একই সময় আদানি থেকে সরবরাহ কমে ৬৯১ মেগাওয়াটে নেমে এলে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াটে। যদিও দুই দিনের চাহিদার মধ্যে পার্থক্য ছিল, তবু আদানি থেকে প্রায় ৭৪০ মেগাওয়াট সরবরাহ কমে যাওয়া জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

দিনের বেলায় পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১০৫ মেগাওয়াট, দুপুর ১টায় ৩ হাজার ৫১ মেগাওয়াট এবং বেলা ৩টায় তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিকেল ৪টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দিনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ঘণ্টায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াটের ওপরে ছিল।

এই ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পল্লী ও শহরের বাইরের বিতরণ ব্যবস্থায়। দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় অংশ পরিচালনা করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীন ৮০টি সমিতি। সরবরাহ কমে গেলে একই এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং করার প্রয়োজন পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। 

আগস্টের শেষ দিকেও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক রাতে সারাদেশে মোট লোডশেডিং ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যার মধ্যে আরইবি এলাকায় ছিল ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।

বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংকটের তীব্রতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৪০০ মেগাওয়াটের নিচে থাকার খবর পাওয়া গেছে। আগের রাত থেকেই সেখানে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করে। এতে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জীবনেও ভোগান্তি বাড়ে।

এর আগে আগস্ট মাসেও দেশে লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি কয়েক দফায় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ১০ আগস্ট রাত ১টায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল; এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট ঘাটতির কথা বলা হয়। একই সময় দেশের ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে পুরোপুরি বন্ধ থাকার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।

ফলে বর্তমান সংকটকে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। উৎপাদন ব্যবস্থায় একদিকে গ্যাসের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি, অন্যদিকে কয়লা সরবরাহের অনিশ্চয়তা, তেলভিত্তিক কেন্দ্রের জ্বালানি-সংকট এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে চলমান রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি ত্রুটি সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক স্তরে চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে তুলনামূলক বড় একটি উৎস আদানি থেকে এক ধাক্কায় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে।

সরকার অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে জানিয়েছিল, রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদনে পিছিয়ে থাকা কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে ঘাটতি ও লোডশেডিং কমতে পারে। ৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার আশাবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরই আদানি ও আরএনপিএলের দুটি ইউনিট একযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই লক্ষ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্ধ ইউনিটগুলো দ্রুত চালু করা এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আদানির বন্ধ ইউনিটটি যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী দ্রুত মেরামত করে গ্রিডে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে এক ধাক্কায় কয়েকশ মেগাওয়াট সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে শুধু একটি ইউনিট চালু করলেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না; কারণ পিজিসিবির সর্বশেষ তথ্যই দেখাচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ব্যবধান এখনো কয়েক হাজার মেগাওয়াট। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ও একাধিক কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়