নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:১০, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৭৯০

ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৭৯০

ফাইল ছবি

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৯০ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৪৪ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনের একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার এবং অন্যজন চট্টগ্রাম বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃতদের মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী। এ দুই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি ১৪১ জনে পৌঁছেছে। চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যান। মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। আগস্টে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ৪৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার পর মাত্র ১১ দিনেই আরও ৪৪ জন মারা যাওয়ায় চলতি মাসটি ইতোমধ্যে বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাসে পরিণত হয়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল; ২০০০ সালে দেশে বড় ধরনের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পর আগস্ট মাসের হিসাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট তৃতীয় সর্বোচ্চ ছিল।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির দিক থেকে ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন-বহির্ভূত এলাকাগুলো এগিয়ে রয়েছে। এ সময়ে সেখানে ২৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৯৬ জন। এর বাইরে ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬২ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬১ জন, খুলনা বিভাগে ৬০ জন, রংপুর বিভাগে ৩৮ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩৩ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ রাজধানী ও ঢাকার বাইরে দুই ক্ষেত্রেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা স্পষ্ট। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও ঢাকার বাইরে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৪৯ হাজার ২২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৬৪৫ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩ হাজার ৪৩৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন মৃতদের ৫২ দশমিক ১ শতাংশই নারী। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী।

সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার দ্রুত বেড়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পাঁচজনের মৃত্যুর পাশাপাশি ১ হাজার ৩২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর ২ সেপ্টেম্বর আরও পাঁচজনের মৃত্যু ও ১ হাজার ১১০ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য আসে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাসের প্রথম তিন দিনেই ১৪ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজার ৫৮৬ জনের হাসপাতালে ভর্তির তথ্য পাওয়া যায়। ৬ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, যা তখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ ছিল। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড তৈরি করে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ৯

তবে পরদিনই পরিস্থিতির আরও একটি উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। ৯ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর ছয়জনের মৃত্যু ও ১ হাজার ৪৯২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ১০ সেপ্টেম্বরের ছয় মৃত্যুর মধ্যে খুলনা বিভাগে দুজন এবং বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মারা যান। ওই দিন পর্যন্ত চলতি মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ৪২ এবং বছরের মোট মৃত্যু ১৩৯-এ পৌঁছেছিল। একদিন পর আরও দুজনের মৃত্যুর ফলে সেপ্টেম্বরের মৃত্যুসংখ্যা ৪৪ এবং বছরের মোট মৃত্যু ১৪১ হয়েছে।

ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতিতে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতিও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সংসদে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ এই পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থলও বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

চট্টগ্রামের পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম নয় দিনেই চট্টগ্রামে ৫৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা পুরো আগস্টে শনাক্ত হওয়া ১ হাজার ২০২ জনের প্রায় অর্ধেক। চলতি বছরে সেখানে মোট ২ হাজার ৬২১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। টানা বৃষ্টিতে নতুন নতুন পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়াকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটে নির্ধারিত ৪০টি শয্যার বিপরীতে ৭১ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে, ফলে হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তীব্রতা বোঝা যায় আগের বছরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলেও। ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। তার আগের বছর ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। আর ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল নজিরবিহীন; সে বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় যা এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ বার্ষিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড।

এ বছরের আগস্টের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির গতি স্পষ্ট করে। আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪৩ জন মারা যান। ২০২৩ সালের আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ এবং ২০১৯ সালের আগস্টে ৫২ হাজার ৬৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মৃত্যুর হিসাবে ২০২৩ সালের আগস্টে ৩৪২ জন এবং ২০১৯ সালের আগস্টে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তৃতীয় সর্বোচ্চ হলেও সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কীটতত্ত্ববিদ সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের সতর্কতা যথেষ্ট নয়; এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি প্রয়োজন। তার মতে, অপর্যাপ্ত মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পাশাপাশি চলমান বৃষ্টিপাত সংক্রমণ আরও বাড়াতে পারে এবং আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সরকারি উদ্যোগে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং জনগণকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও নগর এলাকায় সংক্রমণের চাপ বাড়ছে। একদিকে সেপ্টেম্বরে অস্বাভাবিক দ্রুততায় মৃত্যু বাড়ছে, অন্যদিকে প্রতিদিন এক হাজারের কাছাকাছি বা তার বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানি জমতে না দেওয়া, কার্যকর মশকনিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতা বাড়ানো সবগুলো পদক্ষেপ একই সঙ্গে জোরদার না করলে সামনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়