নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪১, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হয় আমি থাকব, নয় অনিয়ম: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হয় আমি থাকব, নয় অনিয়ম: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঝটিকা পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে রোগীদের নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করানো, হাসপাতালের ভেতরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নমুনা সংগ্রহ এবং চিকিৎসক-নার্সদের সেবা নিয়ে রোগীদের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। পরিদর্শন শেষে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেছেন, হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকবে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বিশেষ করে ডেঙ্গু ইউনিট ঘুরে দেখার পাশাপাশি ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। 

চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, পরীক্ষার রিপোর্ট ও রোগীদের ভোগান্তির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখেন। এ সময় রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে চিকিৎসককে প্রয়োজনের সময় না পাওয়া, নার্সদের সহযোগিতার ঘাটতি, লিফট নিয়মিত চালু না থাকা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একাধিক তলায় ছোটাছুটি করার মতো অভিযোগ উঠে আসে।

পরিদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাপনা। রোগীদের অভিযোগ এবং চিকিৎসার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে মন্ত্রী জানতে পারেন, ডেঙ্গু শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুযোগ মুগদা হাসপাতালেই থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগীকে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। 

মন্ত্রী বলেন, রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বিনামূল্যে করার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে; এরপরও যদি বাইরের লোক হাসপাতালে এসে রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায়, তাহলে এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগের সঙ্গে মুগদা হাসপাতাল নিয়ে সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেরও মিল পাওয়া যায়। ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে দেখা যাওয়ার কথা উঠে আসে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের ভেতরেই রোগীদের কাছে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিভিন্ন পরীক্ষার কথা বলছিলেন এবং নমুনা সংগ্রহ করে বাইরে পরীক্ষা করাচ্ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ ধরনের প্রক্রিয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরিদর্শনের সময় এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যে অভিযোগ শুনে এখানে এসেছি, সেটা শতভাগ সত্যি। 

তিনি বলেন, ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার সুবিধা থাকার পরও বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লোকজন এসে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। তার প্রশ্ন, হাসপাতালে যখন প্রয়োজনীয় সুবিধা রয়েছে, তখন বাইরের লোকজন কীভাবে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মীরা বিষয়টি দেখেও কেন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

আরও পড়ুন: ২৫ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন

সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকার পরও রোগীদের বাইরে পাঠানোর বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির নয়, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

মন্ত্রীও জানিয়েছেন, এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরও হাসপাতালের ভেতরে যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই সেবার জন্য রোগীদের অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি স্পষ্ট করেন।

মুগদা হাসপাতাল পরিদর্শনে রোগীদের কাছ থেকে শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, চিকিৎসাসেবার সামগ্রিক মান নিয়েও অভিযোগ শোনেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

রোগী ও স্বজনরা জানান, প্রয়োজনের সময় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের খুঁজে পাওয়া যায় না। নার্সদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন তারা। হাসপাতালের লিফট নিয়মিত চালু না থাকায় বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনদের এক তলা থেকে আরেক তলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বলেও জানান তারা।

রোগীদের এসব অভিযোগ শুনে মন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেন এবং জানান, চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের অবহেলা, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্তে আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। 

তার ভাষায়, সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল; সেখানে রোগীকে কোনোভাবেই হয়রানি বা অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

মুগদা হাসপাতালকে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকার বাইরে ও প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে এরই মধ্যে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করে ঢাকার তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা এবং প্রয়োজন হলে মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক অবস্থানও মুগদা পরিদর্শনের ঘটনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার পাশাপাশি রোগীদের কাছ থেকে ট্রলি ভাড়া বা অন্য কোনো উপায়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ না দেওয়ার কথা বলেছেন মন্ত্রী। হাসপাতালগুলোতে অভিযান জোরদারের ফলে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী নিয়ে যাওয়ার দালালদের উৎপাত কমেছে বলেও সম্প্রতি দাবি করেছিলেন তিনি।

এদিকে মুগদা হাসপাতাল পরিদর্শনের দিন ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়লে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে রোগীদের অপ্রয়োজনে ঢাকার বড় হাসপাতালমুখী না করে স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬ চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি শনিবার ৬৪ জেলা ও ৫০৩ উপজেলাসহ ইউনিয়ন, পৌরসভা ও মহানগর পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্ত করে পরিষ্কার করার পাশাপাশি সাধারণ ময়লা-আবর্জনাও অপসারণ করা হবে। আগামী শনিবার সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

এই কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্কাউটস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও অনলাইনে যুক্ত থেকে স্থানীয়ভাবে কর্মসূচি পরিচালনা করবেন। সেপ্টেম্বরে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার প্রজনন বাড়ার আশঙ্কা থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এ সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় উদ্বেগ হাম নিয়েও নতুন কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার ঘোষণার অনুযায়ী, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে দ্বিতীয় দফায় বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে পৌঁছেছে এবং অবশিষ্ট টিকাও ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। 
মন্ত্রী জানিয়েছেন, এর আগে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মপ-আপ কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময় দেশে পর্যাপ্ত টিকা মজুত না থাকায় নতুন সরকার দ্রুত টিকা সংগ্রহে উদ্যোগ নেয় এবং ২১ দিনের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এখন সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্বিতীয় দফার বিশেষ ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি চলছে।

সব মিলিয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনটি কেবল একটি হাসপাতালের সেবার মান যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর ব্যয় কমানো, হাসপাতালের ভেতরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম বন্ধ, চিকিৎসক-নার্সের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে। মন্ত্রীর হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকবে মন্তব্য স্বাস্থ্য খাতে চলমান অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন নজর থাকবে, মুগদা হাসপাতালে চিহ্নিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত কত দ্রুত হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়