সাইবার সুরক্ষা আইনে থাকবে না গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের সুযোগ: তথ্যমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম বা কারও কণ্ঠ রোধ করার বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার কোনো সুযোগ রাখা হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ।
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই আইন কোনোভাবেই কাউকে নিপীড়ন বা পেষণ করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে না। অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন যেভাবে সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা বা ভয় দেখানোর কাজে অপব্যবহার করা হয়েছে, নতুন আইনে সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সরকার অত্যন্ত সতর্কভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনার জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ কনসালটেশন ও মতবিনিময় সভার শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ পাঁচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।
তথ্যমন্ত্রী জানান, সাইবার সুরক্ষা আইনটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়নি; বরং এটি বর্তমানে খসড়া প্রণয়ন ও আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যেহেতু আইনের কিছু কিছু শব্দ বা ধারার ভিন্ন বা দ্বৈত অর্থ হওয়ার অবকাশ থাকে, তাই ভবিষ্যতে যেন এসব শব্দের ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে কেউ আইনটির অপব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে খসড়া তৈরির সঙ্গে জড়িতরা অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। অতীতে গত ১৭-২০ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, আইনের ফাঁকফোকর বা শব্দগত অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রগুলোর ওপর একধরনের অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সরকার সেই ধারার পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি সুষম ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
সাইবার সুরক্ষা আইনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে অশালীন ভাষা ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ গালাগাল এবং জননৈতিকতা বিনষ্টকারী নানা কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের অবক্ষয় রোধ করে একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা এই আইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তবে একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, সাইবার সুরক্ষার নামে যেন কোনোভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।
এ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাইবার সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এই দুটি লক্ষ্য কখনোই পরস্পরবিরোধী নয়, বরং এগুলো হওয়া উচিত একে অপরের পরিপূরক। রাষ্ট্র ও নাগরিকের নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান, বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং গঠনমূলক সমালোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে গণমাধ্যমের নিজস্ব মতামত ও পরামর্শের কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে গণমাধ্যমকেও বাঁচাতে হবে: রাষ্ট্রপতি
সভায় সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দিক ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে মেটা, টিকটক কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে নানা ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা পারিবারিক অশান্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এসব সামাজিক অপরাধ ও ক্ষতিকর কনটেন্ট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
আইসিটি মন্ত্রী আরও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে ভুয়া ছবি ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার বুলিংয়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এসব আধুনিক অপরাধের কার্যকর প্রতিকার করা প্রয়োজন। তবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পেশাদার সাংবাদিকতা এবং সাইবার অপরাধের পরিসর যে সম্পূর্ণ ভিন্ন, সে বিষয়টি সরকার মাথায় রাখছে। এই আইন যেন কোনো অবস্থাতেই সাংবাদিকদের কলম ও ক্যামেরা সীমিত না করে, কিংবা জনস্বার্থে পরিচালিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যেকোনো তথ্য বা কনটেন্ট সত্যতা যাচাই না করে দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে দেওয়া কিংবা মানহানিকর বক্তব্য বারবার প্রচার বা পুনঃপ্রচার করার ফলে সমাজে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে সংবাদমাধ্যমসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি ব্যাপকভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চলমান এই আলোচনার প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হচ্ছে না। খসড়া আইনটিকে আরও সময়োপযোগী, ত্রুটিমুক্ত ও গণমাধ্যমবান্ধব করে তুলতে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় পরবর্তী দফার মতবিনিময় সভা আহ্বান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত মতামত ও সুচিন্তিত পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমেই একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সাইবার সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








