৮৮ ঘণ্টায় ৯০ বছরের অমীমাংসিত গণিতের সমাধান করল ওপেনএআই
ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ইতিহাসে এক অভাবনীয় মাইলফলক অর্জনের দাবি করেছে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের নতুন একটি গোপন এআই মডেল এবং প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্টের সমন্বয়ে মাত্র ৮৮ ঘণ্টার দীর্ঘ প্রচেষ্টায় প্রায় এক শতাব্দী ধরে অমীমাংসিত থাকা গণিতের অত্যন্ত জটিল নেভিয়ার-স্টোকস (Navier-Stokes) সমীকরণের সমাধান খুঁজে পাওয়া গেছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বে এই ঘোষণা নিয়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ ও দীর্ঘ ৯০ বছরের রহস্য তরল পদার্থ ও গ্যাসের গতিবিধি—যেমন পানি ও বাতাসের প্রবাহ, বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন কিংবা বিমান চলাচলের সময় বাতাসের বাধা—নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সমীকরণের অস্তিত্ব ও মসৃণতা (Existence and Smoothness) সংক্রান্ত বিষয়টি প্রায় ৯০ বছর ধরে গণিতবিদদের কাছে একটি বড় ধাঁধা ছিল। ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে তরলের প্রবাহ হিসাব করার সময় এর সমাধান সবসময় মসৃণ ও সুনির্দিষ্ট থাকে কি না, তার কোনো গাণিতিক প্রমাণ এতদিন পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা গণিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট (Clay Mathematics Institute) এই সমস্যাটিকে তাদের বিখ্যাত মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম-এর অন্তর্ভুক্ত করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি এই তালিকার যেকোনো একটি সমস্যার সঠিক সমাধান বের করার জন্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে আসছে। তবে ওপেনএআই সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, পুরস্কারের অর্থ দাবি করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই; বরং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআইয়ের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধ্রুই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
যেভাবে এসেছে এই সাফল্য ওপেনএআই সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টের শেষ দিকে তারা একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ এআই মডেলের প্রশিক্ষণ শুরু করে। মডেলটির অসাধারণ গাণিতিক দক্ষতা দেখে গবেষকরা এটিকে বড় কোনো জটিল সমস্যায় প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর মিলেনিয়াম প্রাইজের সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন গুঞ্জন শোনার পর, প্রায় ১০ হাজার স্বয়ংক্রিয় এআই বট বা এজেন্টকে এই কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করতে গুগলের নতুন এআই মডেল
বিপুল এই কর্মযজ্ঞে এআই বটগুলো নিজেদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ বার্তা আদান-প্রদান করে এবং প্রায় ১৩০ বিলিয়ন আউটপুট টোকেন ব্যবহার করে। ওপেনএআইয়ের শীর্ষ মডেলগুলোর বর্তমান বাজারদর হিসাব করলে কেবল এই গবেষণার পেছনের কম্পিউটিং খরচ আনুমানিক ১ কোটি ডলারের মতো হতে পারত। মাত্র ৮৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন কাজের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর এআই এজেন্টগুলো নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার একটি সমাধান উপস্থাপন করে। এরপর লিআন (Lean) নামক একটি সফটওয়্যার সিস্টেমের মাধ্যমে আরও ১৭ ঘণ্টা ধরে সেই প্রমাণের ফরমাল ভেরিফিকেশন বা যাচাই সম্পন্ন করা হয়। ওপেনএআই দাবি করেছে, তারা এই মিলেনিয়াম সমস্যার মূল চারটি বিবৃতির মধ্যে দুটির সমাধান করতে পেরেছে।
স্বাধীন যাচাই ও বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ওপেনএআইয়ের এই চাঞ্চল্যকর দাবির পর বিশ্বজুড়ে গণিতবিদ ও গবেষকদের মধ্যে নানামুখী বিতর্ক শুরু হয়েছে। ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট বা স্বাধীন কোনো গণিতবিদ দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমাধান গ্রহণ বা যাচাই করেনি।
পাশাপাশি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং অ্যানথ্রপিকের গণিতবিদ লেভেন্ট আলপোগে এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অধ্যাপক বাকমাস্টার দাবি করেন, তিনিও একই সমস্যা নিয়ে কাজ করছিলেন এবং গবেষণার কাজে ওপেনএআইয়ের কোডেক্স (Codex) টুল ব্যবহার করতেন। ৩ সেপ্টেম্বর তিনি জানতে পারেন যে তাদের গবেষণার অগ্রগতির কিছু তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে পৌঁছেছিল, যার পরপরই ওপেনএআই ওই একই বিষয়ে কাজ শুরু করে বলে তার সন্দেহ।
তবে এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বাকমাস্টার ও আলপোগের গবেষণা জনসমক্ষে আসার আগে তাদের কাজের কোনো তথ্য ওপেনএআই বা তাদের এআই এজেন্টরা দেখেনি। তাছাড়া ওপেনএআইয়ের তৈরি করা প্রমাণের প্রক্রিয়া এবং চূড়ান্ত ফলাফল ওই দুই গণিতবিদের কাজের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে, খুব ক্ষীণ হলেও ব্যবহারকারীদের প্রডাক্ট ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি পরিচয়বিহীন ডেটা (de-identified data) মডেলের সামগ্রিক উন্নতিতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের মতে, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদী গাণিতিক সমস্যার জট খোলার এই ঘটনা বিজ্ঞান জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, এর পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক গণিত সমাজের কঠোর ও স্বাধীন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








