নিশ্বাস শুঁকে মানুষের ক্যানসার শনাক্ত করবে কুকুর, সহায়তায় এআই
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি স্টার্টআপ ডগনোসিস (Dognosis) কুকুরের অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর যুগলবন্দীতে মানুষের নিশ্বাস থেকে ক্যানসার শনাক্তকরণের এক যুগান্তকারী পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। জার্মানি ও ইসরায়েলের পর বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি তৃতীয়। প্রচলিত পদ্ধতির জটিলতা ও ভীতি দূর করে সম্পূর্ণ অ-আক্রমণাত্মক (Non-invasive) ও সাশ্রয়ী উপায়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
মানুষের শরীরের কোষে ক্যানসার বা অন্য কোনো রোগ বাসা বাঁধলে বিপাকীয় পরিবর্তনের ফলে সেখান থেকে কিছু নির্দিষ্ট উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ বা গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা নিশ্বাসের মাধ্যমে বাইরে আসে। মানুষের নাকে ঘ্রাণশক্তি অর্জনের জন্য প্রায় ৫০ লাখ কোষ থাকলেও কুকুরের রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ঘ্রাণকোষ। এই অবিশ্বাস্য ঘ্রাণক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ডগনোসিস একটি সহজ পরীক্ষা পদ্ধতি তৈরি করেছে। এতে রোগীকে সরাসরি কোনো কুকুরের মুখোমুখি বা হাসপাতালে গিয়ে অস্বস্তিকর পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় না।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে যেকোনো ব্যক্তিকে প্রায় ১০ মিনিট একটি বিশেষ তুলার মাস্কে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে হয়। এরপর সেই মাস্কটি সিল করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। স্নিফস্পেস নামের একটি বিশেষ কেন্দ্রে স্বয়ংক্রিয় ফিডারযুক্ত প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো এই নমুনার ঘ্রাণ নেয়। ক্লোয়ির মতো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরগুলো (যাদের মধ্যে ল্যাব্রাডর, বিগল ও বিভিন্ন মিশ্র জাতের কুকুর রয়েছে) নমুনা পরীক্ষা করে। নমুনায় ক্যানসারের উপস্থিতি টের পেলে কুকুরগুলো নির্দিষ্ট আচরণ করে যেমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কিংবা উত্তেজনায় আঁচড়াতে শুরু করে। সঠিক প্রতিক্রিয়ার জন্য কুকুরগুলোকে সুস্বাদু খাবারের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বেজিয়ান মডেলিংয়ের ভূমিকা
কুকুরের এই শারীরিক ও আচরণগত প্রতিক্রিয়াকে নিখুঁত তথ্যে রূপান্তর করতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কুকুরের মাথায় থ্রিডি প্রিন্ট করা সেন্সরযুক্ত হেলমেট বসানোর পাশাপাশি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়াগুলো রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এআই এবং অ্যাডভান্সড বেজিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেলিংয়ের (Bayesian fusion framework) মাধ্যমে একাধিক কুকুরের দেওয়া প্রতিক্রিয়া ও রোগীর তথ্যগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়। এর ফলে ব্যক্তিগত ভুলের সম্ভাবনা কমে যায় এবং পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল হয়ে ওঠে। স্টার্টআপটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আকাশ কুলগোদ ও ইতামার বিটান জানিয়েছেন, একটি প্রশিক্ষিত কুকুর এক ঘণ্টায় হাজার হাজারবার ঘ্রাণ নিতে পারে এবং প্রতিটি ঘ্রাণের মাধ্যমে পৃথক নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: গান তৈরির নতুন এআই মডেল লিরিয়া ৩.৫ আনল গুগল
ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণার সফলতা
সম্প্রতি কর্ণাটক রাজ্যের ছয়টি হাসপাতালের (যেমন সেন্ট জনস মেডিকেল কলেজ, অ্যাস্টার সিএমআই, নারায়ণা হেলথ ইত্যাদি) সহযোগিতায় এবং ১৫০০-এর অধিক মানুষের ওপর পরিচালিত একটি বড়ো ধাপের (Phase-2) গবেষণা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (Journal of Clinical Oncology)-তে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণায় স্তন, ফুসফুস, মাথা ও গলা, স্ত্রীরোগ এবং পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসারসহ প্রধান সাতটি ক্যানসার শনাক্তকরণে প্রায় ৯০ থেকে ৯১ শতাংশ নির্ভুলতা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১ ও ২) থাকাকালীনও এই প্রযুক্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের হার অত্যন্ত কম (মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি) এবং বেশিরভাগ রোগী শেষ পর্যায়ে গিয়ে রোগ শনাক্ত করেন, যা চিকিৎসাকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে ডগনোসিসের এই প্রযুক্তি প্রাথমিক স্তরে ট্রায়াজ বা ফিল্টারিং টুল হিসেবে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী বছরই প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর পেছনে অ্যাক্সেল ইন্ডিয়ার মতো বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।
তবে বেঙ্গালুরুর রামাইয়া মেমোরিয়াল হাসপাতালের অনকোলজি প্রধান সন্তোষ কুমার দেবদাস এবং মণিপাল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট নীলেশ রেড্ডির মতো ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বললেও চিকিৎসাক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রয়োগের আগে আরও বৃহৎ পরিসরে এবং স্বাধীন গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, প্রচলিত জটিল মেডিকেল পরীক্ষার পাশাপাশি রিয়েল-লাইফ রোগীদের ক্ষেত্রে এটি শতভাগ আস্থার জায়গা তৈরি করতে কতটা সক্ষম, তা সময় ও পরবর্তী বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোই বলে দেবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








