ব্যান্ডউইথ সংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের দ্রুত বর্ধমান চাহিদার বিপরীতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ স্থাপনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো নতুন সক্ষমতা বা ব্যান্ডউইথ যুক্ত করা না গেলে আগামী দশকে দেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অদূরে একটি রিসোর্টে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি)-এর আয়োজনে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব শঙ্কার কথা উঠে আসে।
টিআরএনবির সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইনের সঞ্চালনায় কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান এবং মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রজেক্ট লিড মাহমুদ শাহেদ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে অভূতপূর্ব হারে। ২০১৩ সালে দেশে ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৬ টেরাবিটে। এরপর ২০২০ সালে তা ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিটে উন্নীত হয় এবং বর্তমান বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে তা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র ১৩ বছরের ব্যবধানে দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় ২৬০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট। তবে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ১৯ দশমিক ১ টেরাবিটে। পরবর্তীতে ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে তা ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সার্বিকভাবে শিল্পখাতের ব্যাপক ডিজিটালাইজেশনের কারণে এই চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের মূল ভরসা দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ (SEA-ME-WE-4) এবং সি-মি-উই-৫ (SEA-ME-WE-5)। ক্যাবল দুটির বর্তমান সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ এবং ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। চাহিদার অতিরিক্ত বাকি ব্যান্ডউইথ আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের (আইটিসি) মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা হয়।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল রূপান্তরে কেউ যেন পিছিয়ে না পড়ে: আইসিটি মন্ত্রী
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র দুটি ক্যাবলের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের পুরো ইন্টারনেট খাতকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার চিত্রটি স্পষ্ট হয়। যেখানে প্রতিবেশী ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে সচল সাবমেরিন ক্যাবল মাত্র দুটি। এর ফলে যেকোনো একটি ক্যাবলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, দুর্ঘটনা বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চললে পুরো জাতীয় ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় ও ধীরগতির সৃষ্টি হয়।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। কারণ, প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যেই দেশে প্রায় ২০ টেরাবিটের একটি বিশাল ব্যান্ডউইথ ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
এই সংকট উত্তরণে বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়াকে এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রস্তাবিত নতুন ক্যাবলগুলো চালু হলে দেশের সঙ্গে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে, যার ফলে মোট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
অনুষ্ঠানে মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলে সংযোগ স্থাপিত হলে একদিকে যেমন দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে ইন্টারনেটের পাইকারি মূল্য অর্ধেকে নেমে আসবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর ফলে সেবার মান (Quality of Service) ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, নেটওয়ার্ক ল্যাটেন্সি বা বিলম্ব কমবে এবং দেশে সার্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাদের মূল ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, বরং আইটিসি বা ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল।
বেসরকারি ক্যাবলগুলো যুক্ত হলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর একপাক্ষিক নির্ভরতা কমবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি সাধারণ গ্রাহক তথা খুচরা বাজারেও পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান আলোচনার বিষয়টি কেবল তাৎক্ষণিক ব্যান্ডউইথ সংকটের সমাধান নয়; বরং এটি ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের বাংলাদেশের সার্বিক ডিজিটাল সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অর্থায়ন, সমীক্ষা, সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন এবং বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হয়। ফলে সংকট একেবারে দৃশ্যমান হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতা বা সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে অতীতে সি-মি-উই-৩ ক্যাবল সংযোগের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার মতো আরেকটি কৌশলগত ও ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই ইন্টারনেট খাতের গতিশীলতা, সেবার মান এবং গ্রাহকের খরচ নিয়ন্ত্রণে এখনই সুদূরপ্রসারী ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








