হামে শিশু মৃত্যু: ড. ইউনূসসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল
ফাইল ছবি
রাজধানীর একটি শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) এই রিট মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট ছয়জনকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রিটের পক্ষে আদালতে শুনানি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট জুয়েল আজাদ, যার সাথে ছিলেন অ্যাডভোকেট আবিদা আসমা প্রমি।
গত ২৬ মে শ্যামলীর বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ক্লার্ক মো. শাকিলের সাত মাসের শিশু সাফওয়ান ইসলাম জাহিনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া এবং টিকা সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চরম গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। গত ৬ জুলাই শিশুর পিতা মো. শাকিলের পক্ষে অ্যাডভোকেট জুয়েল আজাদ হাইকোর্টে এই রিট আবেদন দায়ের করেন।
রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যকাল চলাকালীন সময়ে জাতীয় পর্যায়ে টিকা সংগ্রহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে টিকার মজুত ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে যে নজিরবিহীন অবহেলা ও স্থবিরতা দেখা গেছে, তার সঠিক মূল্যায়ন এবং বিচার দাবি করা হয়েছে রিটে। মূলত রাষ্ট্রের নীতিগত ও প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণেই আজ সাধারণ মানুষকে এমন মূল্য দিতে হচ্ছে বলে রিটে দাবি করা হয়।
আরও পড়ুন: হামে শিশুমৃত্যু: ইউনূসসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
এই চাঞ্চল্যকর রিট আবেদনে রাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়েছে। বিবাদীরা হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস (সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি)।
আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর পাশাপাশি তৎকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও বিবাদীর তালিকায় যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক জবাবদিহি সুনিশ্চিত করা।
আদালতের জারি করা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংবিধিবদ্ধ অধিকার ও জীবন রক্ষার মৌলিক গ্যারান্টি অনুযায়ী কেন সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনজনিত কারণে শিশুটির পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে না। এর আগে রিটের প্রাথমিক পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে ৫ লাখ টাকা চিকিৎসা খরচ ও অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা এবং চূড়ান্তভাবে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছিল। আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রুল জারির ফলে কেবল একটি নির্দিষ্ট শিশুমৃত্যুই নয়, বরং চিকিৎসাসেবা প্রদানে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি আইনি কাঠামোর আওতায় আনার পথ সুগম করল।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে হাম ও এর বিভিন্ন জটিল উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মোট ৯৬৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এমতাবস্থায় শিশু সাফওয়ানের মৃত্যুর ঘটনা এবং হাইকোর্টের এই রুল বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্র, টিকার সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি এবং চিকিৎসাসেবায় বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে দেশজুড়ে জোর আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিচারিক পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে দেশের টিকাদান কর্মসূচি ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আরও গতিশীল ও ত্রুটিমুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








