আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩৮, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ১৫:৪০, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভূরাজনৈতিক সংকটে সিন্ধু পানি চুক্তি: আদালতের নির্দেশ মানবে না ভারত

ভূরাজনৈতিক সংকটে সিন্ধু পানি চুক্তি: আদালতের নির্দেশ মানবে না ভারত

ফাইল ছবি

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি এক নতুন ও তীব্র ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। হেগভিত্তিক স্থায়ী সালিশি আদালত (Permanent Court of Arbitration - PCA) পাকিস্তানের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিতের ভারতের একক সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির সব বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নয়াদিল্লিকে। তবে এই রায়কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। 

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হেগভিত্তিক এই আদালত অবৈধভাবে গঠিত এবং এর সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর এ ধরনের সংস্থার কোনো এখতিয়ার নেই।

১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি চুক্তি। গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ এবং তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতা সত্ত্বেও এই চুক্তি কার্যকর ছিল। তবে গত বছর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন বিদেশি ও স্থানীয় পর্যটক নিহত হন। 

নয়াদিল্লির দাবি, ওই হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন তিন হামলাকারীর মধ্যে দুজন পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিলেন। যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগ শুরু থেকেই দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করে আসছে। এই ঘটনার পর ভারত আকস্মিকভাবে দীর্ঘদিনের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের যুগান্তকারী ও কঠোর ঘোষণা দেয় এবং কাশ্মীরে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করে। ভারতের এই পদক্ষেপকে ১৯৬০ সালের চুক্তির কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরিচালিত প্রথম সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তান এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক আদালতের দারস্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী সালিশি আদালত রুল জারি করে জানান, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো পুরোপুরি বহাল ও কার্যকর রয়েছে। চুক্তিটি স্থগিত বা বাতিল করার মতো কোনো বৈধ ও যৌক্তিক কারণ ভারতের ছিল না।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করল যুক্তরাষ্ট্র 

আদালতের রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করতে হবে যে দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি যে পানির ওপর নির্ভরশীল, তার প্রবাহে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, পশ্চিমের নদীগুলোর ওপর অবস্থিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই চুক্তিভিত্তিক সব নিয়ম মেনে চলতে হবে। বিশ্বব্যাংক নিযুক্ত একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে কাশ্মীর অঞ্চলের এসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। ওই নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনার পর পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল এবং পানি প্রবেশ কাঠামো নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরে নির্মাণ না করার অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

এদিকে আদালতের এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, ভারত এই আদালতকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি এবং এর কোনো রায়ই দেশের সার্বভৌম কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলবে না। 

নয়াদিল্লির অভিযোগ, বিশ্বব্যাংক মূল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে একতরফা ও আইনবহির্ভূতভাবে এই সালিশি আদালত গঠন করেছে, তাই এর কোনো বৈধতা নেই। ভারত এই সংস্থার কার্যক্রমে কখনো অংশ নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও এর কোনো সিদ্ধান্ত মানবে না।

অন্যদিকে, আদালতের এই রায়কে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলতে ভারত আইনগতভাবে বাধ্য। 

পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, নয়াদিল্লিকে অবশ্যই চুক্তির শর্ত মেনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে। জলসম্পদ ও কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তানের অর্থনীতিতে এই রায়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়