জন্মের পরই ‘এক-আইডি’তে মিলবে নাগরিক সেবা
ছবি: সংগৃহীত
দেশের সব নাগরিককে জন্মের পর থেকেই একটি একক ও স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি বা এক-আইডি নামে প্রস্তাবিত এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের মতো পৃথক পরিচয়পত্র ও তথ্যভান্ডার ব্যবহৃত হলেও নতুন ব্যবস্থায় নাগরিকের পরিচয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বা ডি-স্টার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মেয়াদের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, এটি এখনো অনুমোদিত বা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া কোনো সরকারি সেবা নয়; বরং প্রস্তাবিত একটি জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় অবকাঠামো।
জন্মনিবন্ধন থেকে আজীবন পরিচয়
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জন্মের পরই প্রতিটি শিশুকে একক পরিচয়ের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে জন্মের পর শিশুকে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয় এবং ১৮ বছর বয়স হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নতুন ব্যবস্থায় বয়সের এই সীমা থাকবে না। একজন নাগরিকের পরিচয় জন্মের সময় তৈরি হয়ে তা সারা জীবন বহাল থাকবে এমন ধারণার ভিত্তিতেই এক-আইডি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে একই নাগরিকের তথ্য বারবার সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমানোই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে নাগরিক সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্ট থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত ও প্রতিরোধের সুযোগও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এক কার্ডে বিভিন্ন সেবার পরিকল্পনা
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক-আইডি চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ডের সঙ্গে যুক্ত সেবাগুলো এই একক পরিচয়ের আওতায় আনা হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো ব্যবস্থার সেবা ভবিষ্যতে নতুন পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে কোন কার্ডের কোন সেবা কীভাবে একীভূত হবে, বিদ্যমান কার্ডগুলোর কার্যকারিতা কখন এবং কীভাবে পরিবর্তিত হবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নাগরিকের পরিচয়, সরকারি সেবা গ্রহণ এবং ডিজিটাল লেনদেনের মধ্যে সমন্বয় তৈরির ধারণাও রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এই ধারণাকে ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ, একজন নাগরিকের একটি ডিজিটাল পরিচয় থাকবে, যার সঙ্গে ভবিষ্যতে ডিজিটাল ওয়ালেট যুক্ত হতে পারে। তবে নতুন পরিচয়পত্রে ঠিক কোন কোন তথ্য থাকবে এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের কাঠামো কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
আরও পড়ুন: সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশী
১৮ কোটি নাগরিকের জন্য ২০ কোটি কার্ড
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ করা হবে ২০ কোটি। প্রতিটি কার্ড হবে পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড। উৎপাদন ও মুদ্রণে প্রতিটি কার্ডের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই ডলার, যা বর্তমান বিনিময়মূল্যে প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে বিতরণ ও সরবরাহ ব্যয় হিসেবে আরও এক ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ধরা হয়েছে। ফলে উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডের আনুমানিক ব্যয় দাঁড়াবে ৩৬৯ টাকা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসার কথা রয়েছে। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হিসেবে ধরা হয়েছে কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিতরণ। এই খাতে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
বিদ্যমান কার্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্ন
দেশে বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে নাগরিকের একই তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমতে পারে। এতে সেবা গ্রহণের সময় ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনায়ও সমন্বয় বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্রকে একক পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও সেই ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়। তাঁর মতে, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে বিদ্যমান এনআইডি ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করে একই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে প্রকল্পটি পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এর ব্যয় ও বাস্তবায়ন কাঠামো মূল্যায়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকারের পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো বিভিন্ন সেবাভিত্তিক কার্ডের কথাও রয়েছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও তথ্য সংগ্রহে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ডে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে প্রবাসী কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডের ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি। এসব উদ্যোগের সঙ্গে এক-আইডি কীভাবে সমন্বিত হবে, তা বাস্তবায়নের সময় স্পষ্ট হবে।
বিদেশি অভিজ্ঞতা ও তথ্য সুরক্ষা
বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একক ডিজিটাল পরিচয় কাঠামো তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব দেশের ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা থেকে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ডি-স্টার প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল সরকারি সেবা, তথ্য বিনিময় এবং পরিচয় ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হচ্ছে।
তবে একক পরিচয়ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবহারের অনুমতি, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সীমা এবং তথ্য সংশোধনের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। এ কারণে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণের সময় তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়
এক-আইডি প্রকল্পের ধারণা ও ব্যয়ের প্রাথমিক প্রস্তাব তৈরি হলেও এটি এখনো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা, অর্থায়ন কাঠামো নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য পরিচয়পত্রের ধরন, তথ্যের পরিমাণ, বিতরণ পদ্ধতি এবং বিদ্যমান এনআইডি ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের সঙ্গে এর সম্পর্কও তখন নির্ধারিত হবে।
সরকারের লক্ষ্য, জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে তাঁর সরকারি সেবা গ্রহণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, নাগরিকের আস্থা, তথ্য সুরক্ষা এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








