সাত মাসে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ, এখনো সন্ধান নেই ২ হাজারের
ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি।
পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে, নিখোঁজের জিডি হওয়া শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশের সন্ধান পাওয়া গেলেও ১৩ শতাংশ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদরদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
পুলিশের এই পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের পরবর্তী অবস্থা, কতজন উদ্ধার হয়েছে কিংবা কতজন পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে সে তথ্য উল্লেখ না থাকায় পুরো চিত্রটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি নিরসন এবং নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো উদ্ধার হয়নি ৬৮ জন। অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এ বয়সসীমার ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। দুই বয়সসীমার তথ্য মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি পাওয়া গেছে।
এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোট নিখোঁজের জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিয়ে। বিপরীতে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জিডির সংখ্যা ৪৭৪। তবে বয়সভিত্তিক জিডির সংখ্যা দিয়ে নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি বা কারণ নির্ধারণ করা যায় না; পুলিশ যে কারণগুলো জানিয়েছে, সেগুলো নিখোঁজের ঘটনাগুলোর যাচাই-বাছাই থেকে পাওয়া সাধারণ প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের ব্যাখ্যায়, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে প্রধানত পথ হারিয়ে ফেলা, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা এবং একা বাসায় ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো কারণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে যাওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো কারণ চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এ ছাড়া অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের চেষ্টা এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যাও নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলো সব ক্ষেত্রে একই ধরনের নয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত বিচ্ছিন্নতা বা পথ হারানোর মতো বিষয় বেশি প্রাসঙ্গিক হলেও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক, মানসিক ও সামাজিক নানা কারণ ভূমিকা রাখছে। ফলে নিখোঁজের তথ্য বিশ্লেষণে বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং ঘটনার পরবর্তী অবস্থা সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন: সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশী
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, পুলিশি সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু রয়েছে। এর ফলে সাধারণ ডায়েরির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির পরিসংখ্যানও এই ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হওয়ায় আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করার সময় জিডি করার সুযোগ ও প্রক্রিয়ার পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৪১৪টিতে। ২০২৫ সালে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি বেড়ে হয় ২২ হাজার ৫৫০টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এটি পুরো বছরের হিসাব নয়; তাই আগের বছরগুলোর পূর্ণ বছরের সংখ্যার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে নিখোঁজের প্রবণতা বেড়েছে বা কমেছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
পুলিশ সদরদপ্তর বলছে, কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু জিডির সংখ্যা উল্লেখ করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। একই সময়ে কতজন উদ্ধার হয়েছে, কতজন পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ এসব তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ, নিখোঁজের জিডি হওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে শিশু দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ রয়েছে এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশু পরে উদ্ধার হয় বা পরিবারের কাছে ফিরে আসে।
এ কারণে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের পরিসংখ্যানে ১৫ হাজার ৭১৭টি নিখোঁজের জিডির পাশাপাশি ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরে আসার তথ্যও দিয়েছে পুলিশ। তবে উদ্ধার হওয়া শিশুদের মধ্যে কতজন স্বাভাবিকভাবে পরিবারের কাছে ফিরেছে, কতজনকে পুলিশ উদ্ধার করেছে কিংবা কতজনের ঘটনায় অপরাধের অভিযোগ ছিল এসব বিষয়ে বিস্তারিত বিভাজন প্রকাশিত বার্তায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এই পরিসংখ্যান নিখোঁজের জিডি ও উদ্ধার পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র দেয়, কিন্তু শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ বা ফলাফল ব্যাখ্যা করে না।
পুলিশের হিসাবে, সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৬৮ জন এবং ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৯৭০ জন রয়েছে। অর্থাৎ এখনো নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী।
এই সংখ্যাটি শিশু সুরক্ষা, পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। কারণ, উদ্ধার না হওয়া প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে পরিবারের উদ্বেগের পাশাপাশি তার নিরাপত্তা, অবস্থান এবং নিখোঁজ হওয়ার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ উদ্ধার হলেও এখনো সন্ধান না পাওয়া শিশুদের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
শিশু নিখোঁজের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পরিসংখ্যান প্রকাশের ক্ষেত্রে জিডির সংখ্যা, উদ্ধার হওয়া শিশু এবং এখনো নিখোঁজ শিশু এই তিনটি তথ্য একসঙ্গে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বয়সভিত্তিক বিভাজন, নিখোঁজ হওয়ার কারণ এবং ঘটনার পরবর্তী অবস্থা জানা গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক বার্তায় এই বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এটুকু স্পষ্ট যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু। এই পরিসংখ্যানকে একদিকে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর তথ্য হিসেবে দেখা প্রয়োজন, অন্যদিকে উদ্ধার না হওয়া শিশুদের সন্ধান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








