বাংলাদেশসহ ৩১ দেশের মাল্টিপল ভিসা সুবিধা বাতিল করল মালয়েশিয়া
ফাইল ছবি
বাংলাদেশসহ ৩১টি দেশের নাগরিকদের জন্য সামাজিক ভ্রমণে মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা (এমইভি) সুবিধা সীমিত করেছে মালয়েশিয়া। নতুন নীতিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আগের মতো সাধারণভাবে এক বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা পাওয়ার সুযোগ থাকছে না। পর্যটন, পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা এবং অন্যান্য সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা (এসইভি) প্রযোজ্য হবে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সব দেশের নাগরিকদের জন্য ঢালাওভাবে এমইভি দেওয়ার আগের ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ঘোষণা সরকারি ওয়েবসাইটে ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
নতুন ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের মালয়েশিয়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসার ধরন নির্বাচনে পরিবর্তন আসবে। এর আগে যোগ্যতা ও অনুমোদনসাপেক্ষে সামাজিক ভ্রমণের জন্য এমইভি পাওয়ার সুযোগ ছিল, যার মেয়াদ সাধারণত তিন মাস থেকে ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারত। তবে প্রতিটি প্রবেশে সর্বোচ্চ ৩০ দিন অবস্থানের অনুমতি থাকত এবং ভিসার মেয়াদ থাকলেও প্রতিটি প্রবেশের জন্য নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য ছিল। নতুন নীতিতে বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের সাধারণ সামাজিক ভ্রমণের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসাই মূল ব্যবস্থা হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এমইভি এখন আর সব দেশের নাগরিকদের জন্য স্বয়ংক্রিয় বা ঢালাওভাবে দেওয়া হবে না। তবে নির্দিষ্ট ভ্রমণ উদ্দেশ্যে এই সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক ভ্রমণ, চিকিৎসা, ফ্লাই অ্যান্ড ক্রুজ এবং ওয়েডিং ট্যুরিজম। অর্থাৎ, সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মে সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা প্রযোজ্য হলেও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আবেদনকারীরা এমইভির জন্য বিবেচিত হতে পারেন। ভিসা অনুমোদনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
সামাজিক ভ্রমণের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা বাধ্যতামূলক করা ৩১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, বুরকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, কলম্বিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, জিবুতি, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, গিনি-বিসাউ, ঘানা, ভারত, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া, মালি, মোজাম্বিক, মিয়ানমার, মন্টেনেগ্রো, নেপাল, নাইজেরিয়া, নাইজার, পাকিস্তান, রুয়ান্ডা, সার্বিয়া ও শ্রীলঙ্কা। মালয়েশিয়ার সরকারি মাইভিসা প্ল্যাটফর্মে এই ৩১ দেশের নাগরিকদের সামাজিক ভ্রমণের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি ৩১ দেশের এই তালিকা মালয়েশিয়ায় প্রবেশের জন্য ভিসা-প্রয়োজনীয় সব দেশের তালিকা নয়; এটি সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার আওতাভুক্ত দেশগুলোর তালিকা। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের দেশভিত্তিক ভিসা-প্রয়োজনীয়তার তালিকায় বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ভিসা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে, কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বা শর্তসাপেক্ষে ভিসা অব্যাহতি রয়েছে। ফলে কোনো দেশের নাগরিকের জন্য ভিসা লাগবে কি না এবং ভিসার ধরন কী হবে এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের
মালয়েশিয়ার সরকারি ভিসা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের সাধারণ বাংলাদেশি পাসপোর্টে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের জন্য ভিসা প্রয়োজন এবং সামাজিক ভ্রমণে সাধারণত সর্বোচ্চ ৩০ দিন অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়। দেশটির হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা ইস্যুর তারিখ থেকে তিন মাস পর্যন্ত বৈধ থাকে এবং একবার মালয়েশিয়ায় প্রবেশের পর তা আর ব্যবহার করা যায় না। কোনো ভ্রমণকারী ওই সময়ের মধ্যে ভ্রমণ করতে না পারলে নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হয়।
ভিসার মেয়াদ ও অবস্থানের সময়সীমা এক বিষয় নয় এটিও নতুন নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ সাধারণত তিন মাস হলেও, মালয়েশিয়ায় প্রবেশের পর অনুমোদিত অবস্থানের সময়সীমা আলাদা নিয়মে নির্ধারিত হয়। একইভাবে, এমইভির মেয়াদ ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারলেও প্রতিটি প্রবেশে ৩০ দিনের বেশি অবস্থান করা যায় না এবং অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাই এক বছরের ভিসা পাওয়া মানেই একটানা এক বছর মালয়েশিয়ায় থাকার অনুমতি নয়।
নতুন নীতির প্রভাব মূলত ভিজিট ভিসা বা সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি বা অন্যান্য বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট কিংবা কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত ভিসার ওপর এর সরাসরি কোনো প্রভাব নেই। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পড়াশোনা, কাজ বা অন্যান্য নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ভিসা উইথ রেফারেন্স (ভিডিআর) অথবা সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্রের ভিত্তিতে ভিসা প্রক্রিয়া আলাদাভাবে পরিচালিত হয়। ফলে সামাজিক ভ্রমণের এমইভি নীতি পরিবর্তনকে কর্মীদের ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। মালয়েশিয়ার হাইকমিশন জানিয়েছে, চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরা ভিসা উইদাউট রেফারেন্সের আওতায় আবেদন করতে পারেন এবং মালয়েশিয়ান হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিল (এমএইচটিসি)–এর নিবন্ধিত চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এ ধরনের ভ্রমণ সাধারণ পর্যটন ভ্রমণের মতো নয়; চিকিৎসার উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে আবেদন বিবেচনা করা হয়।
মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সময় বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা, থাকার জায়গার প্রমাণ এবং ফেরত বা পরবর্তী গন্তব্যের টিকিট দেখাতে হতে পারে। দেশটির পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রবেশ-শর্তে বলা হয়েছে, বিদেশি পর্যটকদের নিজেদের পরিচয় ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হতে হবে এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথি চাইতে পারে। একই সঙ্গে, আগের ভ্রমণ-সংক্রান্ত কোনো নিষেধাজ্ঞা বা সন্দেহজনক তালিকায় থাকা যাবে না।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য নতুন নীতির বাস্তব অর্থ হলো, মালয়েশিয়ায় বারবার ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলেও সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে আগের মতো এক বছরের এমইভি পাওয়ার সুযোগ সাধারণভাবে থাকবে না। প্রতিটি ভ্রমণের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে ব্যবসা, চিকিৎসা, ফ্লাই অ্যান্ড ক্রুজ বা ওয়েডিং ট্যুরিজমের মতো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এমইভির সুযোগ থাকায় আবেদনকারীদের ভ্রমণের প্রকৃতি অনুযায়ী যথাযথ ভিসা শ্রেণি বেছে নিতে হবে।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের ঘোষণাটি পর্যটকদের ভিসা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনলেও, এটি বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা বা ভিসা সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নয়। বরং সামাজিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার পরিবর্তে সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই ভ্রমণের আগে ভিসার ধরন, আবেদন-শর্ত, প্রয়োজনীয় নথি এবং অনুমোদিত অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








