হরমুজে সৌদি তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলা, ২ নাবিক নিহত
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বহন করে যাওয়ার সময় সিদর নামের একটি সুপারট্যাংকারে হামলার ঘটনায় ফিলিপাইনের দুই নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে সৌদি আরব। তবে রিয়াদের এই অভিযোগের বিষয়ে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সৌদি জাতীয় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান বাহরি জানিয়েছে, গত সোমবার রাতে জাহাজটি একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। পরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছে।
বাহরির বিবৃতি অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় সিদর হামলার মুখে পড়ে। জাহাজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থানকালে ট্যাংকারটিতে কয়েকটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। সৌদি মালিকানাধীন এই জাহাজটি বাহরির বহরে পরিচালিত একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একই সময় মুসান্দাম উপদ্বীপের পূর্বদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন সেনেগাল প্রসপারিটি নামের আরেকটি সুপারট্যাংকারেও হামলার ঘটনা ঘটে।
ফিলিপাইনের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার সময় সিদর-এ ১৬ জন ফিলিপিনো নাবিক ছিলেন। হামলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে গেলে ক্রুরা তা নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে দুই নাবিক প্রাণ হারান। বেঁচে যাওয়া ১৪ জন নাবিক নিরাপদে আছেন এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। নিহতদের মরদেহ ওমানে নেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের অভিবাসী শ্রমিকবিষয়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দূতাবাস ও ওমানে কর্মরত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো মরদেহ ও জীবিত নাবিকদের দেশে ফেরাতে ওমানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে।
সৌদি আরবের অভিযোগের বিষয়ে ইরান এখনো সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। তবে এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে আগুন ধরে যায়।
ইরানের দাবি ছিল, জাহাজ দুটি প্রণালিটির একটি অনুমোদনহীন পথ দিয়ে চলাচল করছিল।
এদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় দুটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজ দুটিতে সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে বোঝাই করা অপরিশোধিত তেল ছিল।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সিদর ট্যাংকারে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই বিবৃতিতে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলারও নিন্দা জানানো হয়।
সৌদি সরকার বলেছে, উত্তেজনা কমিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা জরুরি। বাহরিও জানিয়েছে, তারা জাহাজটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সামুদ্রিক শিল্পের অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালির নাম বদলের প্রস্তাব ও নতুন যুদ্ধের হুংকার ট্রাম্পের
হরমুজ প্রণালিতে এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রাতে দুটি ট্যাংকারে হামলার পরদিনও প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ছিল। কেপলার ও অন্যান্য সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, সোমবার হরমুজ প্রণালিতে মাত্র পাঁচটি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৪টি।
এর আগে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, ৩১ আগস্ট হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় একটি ট্যাংকারে তিনটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। পরে জানা যায়, ওই ঘটনায় জড়িত জাহাজগুলোর একটি ছিল সৌদি মালিকানাধীন সিদর। বাহরির বিবৃতিতে হামলার বিস্তারিত কারণ বা অস্ত্রের ধরন জানানো হয়নি।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোকে সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ফলে হামলাটি ইরানি বাহিনীর সরাসরি আক্রমণ, নাকি সামুদ্রিক মাইনের বিস্ফোরণ এ বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে জুলাইয়ে বাহরির আরেকটি সুপারট্যাংকার ওয়েদইয়ান ওমানের উপকূলের কাছে হামলার মুখে পড়েছিল। একই সময়ে সৌদি মালিকানাধীন মাসা ও আমজান নামের আরও দুটি জাহাজ লোহিত সাগরে হামলার শিকার হয়। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের হুমকি দেওয়ার পর এসব হামলা ঘটে। এতে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের বিকল্প পথগুলো নিয়েও নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে হামলার ঘটনায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হওয়ার খবরটি সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরুর পর।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে অন্তত ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার অভিযোগও করেছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এ বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে ইরানি হামলার খবরের পর এসব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
রয়টার্স জানিয়েছে, জুলাইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
সৌদি আরবের অভিযোগের বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না আসায় হামলার দায় এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে দুই ফিলিপিনো নাবিকের মৃত্যু হরমুজ প্রণালিতে চলমান সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকটের গুরুতর দিকটি সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উত্তেজনা কমানো এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








