ভোতেকোশির বন্যায় থমকে গেল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ
ছবি: সংগৃহীত
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীতে সংঘটিত ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের জেরে দেশটির জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে ভারতীয় সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বর্তমানে কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
গত ২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ হড়পা বান ও ভূমিধস নামে। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদী তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয় এবং পরবর্তীতে এই স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তল্লাশির তথ্য অনুযায়ী মর্মান্তিক প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়।
বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির নির্দিষ্ট যে পথটি তৈরি হয়েছিল, তার মূল কেন্দ্রগুলোই এই দুর্যোগের শিকার হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) এবং ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন)-এর মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল।
চুক্তি মোতাবেক, ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে (বা চিলমি) জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতীয় গ্রিড ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে মার্কিন ডলারে রপ্তানি করার কথা ছিল। কিন্তু বন্যায় এই দুটি কেন্দ্রই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত সপ্তাহ থেকে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
সাধারণত বর্ষা মৌসুমে নেপালের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করে দেশটি গত কয়েক বছরে নিজেদের একটি উদীয়মান আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমেও নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আসছিল। তবে এবারের আকস্মিক বন্যায় সৃষ্ট বিপর্যয়ে উৎপাদন কমে তা প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) তথ্যমতে, বন্যায় কেবল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রকল্প দুটিই নয়, দেশটির মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে সানজেন, আপার সানজেন এবং সালাসুঙ্গি প্রকল্পগুলোকে আইসোলেটেড মোড-এ রেখে কেবল স্থানীয়ভাবে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভূরাজনৈতিক সংকটে সিন্ধু পানি চুক্তি: আদালতের নির্দেশ মানবে না ভারত
উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ৯৩২ কোটি (২৯.৩২ বিলিয়ন) নেপালি রুপির বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছিল। একই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১ হাজার ২৩ কোটি রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করলেও নিট বিদ্যুৎ বাণিজ্যে দেশটির উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৯০৯ কোটি রুপি। বর্তমান আকস্মিক বন্যা এই বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে নানাবিধ কাঠামোগত ও ভূ-রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির কড়া নীতিমালা এবং ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত জটিলতা এর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে, যেসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ, চীনা ঠিকাদার বা চীনা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ ভারত নিজ ভূখণ্ড দিয়ে নিতে বরাবরই অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ৪৫৬ মেগাওয়াটের আপার তামাকোশি প্রকল্প, যার সিভিল কাজ চীনা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সম্পাদিত হওয়ায় ভারত এখনো এর আমদানির অনুমতি দেয়নি।
এছাড়া, গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি (জেএসসি) বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের সঙ্গে অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও নেপাল নীতিগতভাবে একমত হলেও ভারতীয় সঞ্চালন লাইনের অতিরিক্ত ব্যবহারের অনুমোদন এখনো ঝুলে আছে। পাশাপাশি, আপার চামেলিয়া, সেতি রিভার এবং আপার তাদি খোলা এই তিনটি প্রকল্পের মোট ৭৩.৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির মেয়াদ গত জুন ও জুলাই মাসে শেষ হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা এখনো নবায়ন করেনি।
বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পর সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (এনইএ)। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প অন্য কোনো সচল প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পাঠানোর অনুমতির জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কাঠমান্ডু ও ঢাকার মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক গ্রিড কানেক্টিভিটির সুরক্ষায় এখন দ্রুত ও টেকসই বিকল্প সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








