নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:০২, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, প্রাণহানি ৯৮৩

হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, প্রাণহানি ৯৮৩

ফাইল ছবি

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৬৩ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ৩৪ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) সকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮৩ জনে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৮৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৯৯ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের। তবে এই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। 

বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট ১ হাজার ৯৭ জন নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষায় ৬৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং ১ হাজার ৩৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এক দিনে উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ দুই শ্রেণি মিলিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে ৯৫৩ জনকে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসা শেষে ৯৫৯ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বরের হিসাবে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১ হাজার ২৩১ জন এবং হামের উপসর্গে মারা গিয়েছিল ছয় শিশু। এক দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও রোগীর চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে হামের উপসর্গযুক্ত বা সন্দেহজনক রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৪৪৭ জনের শরীরে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে এ সময়ে হামের উপসর্গ পাওয়া মোট রোগীর তুলনায় পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা অনেক কম হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জন। চিকিৎসা শেষে তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৭ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিসংখ্যানে মৃতদের বয়সভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বিভাজন প্রকাশ করা হয়নি। তবে হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে সর্বশেষ মৃত্যুগুলো শিশুদের হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে চারজন শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম যেকোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে, তবে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত টিকাদান, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে।

দেশে চলমান এই পরিস্থিতিতে সন্দেহজনক বা উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা আলাদাভাবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে ১৫ মার্চ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪ জনকে হামের উপসর্গযুক্ত বা সন্দেহজনক রোগী হিসেবে গণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৪৭। একইভাবে মৃত্যুর হিসাবেও ৮৮৪ জনকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত এবং ৯৯ জনকে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত হিসেবে আলাদা করা হয়েছে। প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া মৃত্যুগুলোকে নজরদারি ব্যবস্থায় হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর অংশ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে এ কারণেই মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৯৮৩-এ পৌঁছেছে।

আরও পড়ুন: কমছেই না হামের প্রকোপ, ২৪ ঘণ্টায় ৬ শিশুর মৃত্যু

বিভাগভিত্তিক চিত্রেও পরিস্থিতির তীব্রতার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এরপর রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিভাগ। একটি প্রকাশিত বিভাগভিত্তিক হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে ৩৯৮, সিলেটে ১৫১, রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ৭৫, চট্টগ্রামে ৬৪, বরিশালে ৫৬, খুলনায় ৩৪ এবং রংপুরে ১৪ জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার মৃত্যুতেও ঢাকা বিভাগের তিনজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগের একজন থাকায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রোগের চাপ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

চলমান প্রাদুর্ভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাসপাতালে রোগীর চাপ। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জনকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৭ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেও ৯৫৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ৯৫৯ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। অর্থাৎ দৈনিক ভর্তি ও ছাড়পত্রের সংখ্যা কাছাকাছি থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।

হামের উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়াও পরিস্থিতির ব্যাপকতা স্পষ্ট করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৩৪ জনের মধ্যে উপসর্গ পাওয়ায় ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীর মোট সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪-তে পৌঁছেছে। একই সময়ে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৪৭। সরকারি হিসাবে এই সময়জুড়ে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আওতায় আসছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব বলছে, পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু নতুন সংক্রমণ নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রাণহানি। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে এবং ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু না থাকলেও উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু মোট প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে হাম মোকাবিলায় রোগী শনাক্তকরণ, হাসপাতালে চিকিৎসা, সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি থাকলে প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর টিকাদান নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের হাম পরিস্থিতির সরকারি চিত্র বলছে প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একদিকে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী ও প্রায় ২০ হাজার নিশ্চিত সংক্রমণ, অন্যদিকে ৯৮৩ জনের মৃত্যু এবং ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপ্তি তুলে ধরছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমলেও প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষ হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতিকে এখনো উচ্চঝুঁকির জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেই দেখার সুযোগ রয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়