ক্রমেই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি, একদিনে রেকর্ড ১,৩২৪
ফাইল ছবি
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩২৪ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা। নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়া রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ১৭০ জনে। এদিকে পাঁচজনের মৃত্যুতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০২।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ আগস্টে যে মাত্রায় বেড়েছিল, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৩২৪ রোগী চলতি বছরের এক দিনের সর্বোচ্চ। এর আগের দিন সোমবার ১ হাজার ১৬৩ জন, রোববার ১ হাজার ৯৭ জন এবং শনিবার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। অর্থাৎ টানা চার দিন ধরে প্রতিদিনই আগের দিনের রেকর্ড ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা। ৩১ আগস্টের ১ হাজার ১৬৩ জনের আগের রেকর্ডটি ছিল ৩০ আগস্টের ১ হাজার ৯৭ জন; তার আগে ২৪ আগস্ট ৯৯৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সে সময়ের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা তৈরি করেছিলেন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে রাজধানী ও এর আশপাশের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য চাপ দেখা গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৪২ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৩৮ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি হয়েছেন আরও ২৯৮ জন। অর্থাৎ ঢাকা বিভাগে সিটি করপোরেশনসহ মোট নতুন রোগী ৫৭৮ জন। এর বাইরে খুলনা বিভাগে ২৪৬, চট্টগ্রামে ১৩৯, বরিশালে ১২১, রাজশাহীতে ১১৪, ময়মনসিংহে ৮৭, রংপুরে ৩৪ এবং সিলেটে পাঁচজন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
নতুন আক্রান্তের পাশাপাশি গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন নারী ও দুজন পুরুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের দুজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, একজনের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা ১০২ জনে পৌঁছেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে দুইজন, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে সর্বোচ্চ ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিনেই আরও পাঁচজনের মৃত্যু হলো। ফলে আগস্টের ৪৩ মৃত্যুসহ চলতি বছরের মোট প্রাণহানির অর্ধেকের কাছাকাছি হয়েছে মাত্র জুন-আগস্ট তিন মাসে।
আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির মাত্রা আরও স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা এক মাসে চলতি বছরের সর্বোচ্চ এবং জুলাইয়ের ৯ হাজার ২০৬ জনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৬ সালের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগস্টের এক মাসেই যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তা বছরের প্রথম সাত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীর সম্মিলিত সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে একদিনে আক্রান্ত ১১৬৩, মৃত্যু ৪
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১ জানুয়ারি থেকে ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৩৭ হাজার ১৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৩৮৫ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ১৮০ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৬৮৩ জন। অর্থাৎ নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়া রোগীর চেয়ে ১৪৪ জন বেশি, ফলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর চাপ আরও বেড়েছে।
রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তারও এখন বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ২৪৬ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং আগস্টজুড়ে খুলনা বিভাগে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার তথ্য পরিস্থিতির আঞ্চলিক বিস্তারকে সামনে এনেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে খুলনা বিভাগে ৩ হাজার ৮০০ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যেখানে জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৫২। একই সময়ে বিভাগটিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যু জুলাইয়ের পাঁচজন থেকে বেড়ে আগস্টে ১২ জন হয়েছে। খুলনা জেলায় আগস্টে ২ হাজার ২৩ জন এবং বাগেরহাটে ১ হাজার ৯৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন; খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ১ হাজার ৩৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বগতি শুধু সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তৈরি হয়নি; জুলাই থেকে এর প্রবণতা দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে। জুনে ১৩ জনের মৃত্যুর পর জুলাইয়ে মৃত্যু বেড়ে ৩৬ জনে দাঁড়ায়। আগস্টে আরও সাতজন বেশি, অর্থাৎ ৪৩ জন মারা যান। একইভাবে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ থেকে আগস্টে বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ হয়েছে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২৩ শতাংশ। আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রতিদিনের নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ২৪ আগস্ট ৯৯৪, ৩০ আগস্ট ১ হাজার ৯৭, ৩১ আগস্ট ১ হাজার ১৬৩ এবং ১ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১ হাজার ৩২৪ জন।
তবে চলতি বছরের পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও এটি দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাণহানি বা সর্বোচ্চ আক্রান্তের বছর নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়; সে বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জন মারা যান; ২০২৫ সালে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। তবে চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নগর ও গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত মশকনিধন এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সতর্কতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করছে। বিশেষ করে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রম দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। একদিকে প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে মৃত্যুও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








