নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:১৯, ৩০ আগস্ট ২০২৬

তিন বছরের অপেক্ষা শেষে আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক

তিন বছরের অপেক্ষা শেষে আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নানা জল্পনা-কল্পনা ও নীতিগত পরিবর্তনের পর অবশেষে দেশের আর্থিক খাতে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিতীয় দফার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবেদন করা ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সেরা ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পর্ষদ বৈঠকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রথাগত ব্যাংকের মতো এসব ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো ইট-পাথরের শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম বুথ থাকবে না। গ্রাহকরা সম্পূর্ণ ক্যাশলেস বা কাগজবিহীন ব্যবস্থায় কেবল মোবাইল অ্যাপ ও স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, অর্থ জমা দেওয়া, বিভিন্ন লেনদেন সম্পন্ন করা এবং ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি আধুনিক ভার্চুয়াল কার্ড এবং কিউআর কোডভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবাও যুক্ত থাকবে। এর ফলে প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং প্রথাগত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর এই দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, নীতিমালার কাঠামোগত পরিবর্তন এবং নানা জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে দ্বিতীয় দফার আবেদন থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে মূলধন, উদ্যোক্তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক শর্ত পালনের বিষয়গুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, দ্বিতীয় দফায় জমাকৃত আবেদনগুলোর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন কার্যক্রম বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আসন্ন পর্ষদ বৈঠকেই বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হবে।

২০২৩ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করে। সে সময় একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। সে দফায় ব্যাপক সাড়া মিলে এবং ৫২টি আবেদন জমা পড়ে। পরবর্তীতে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই শেষে ৯টি প্রস্তাব পর্ষদে উত্থাপন করা হয় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে লেটার অব ইনটেন্ট বা আগ্রহপত্র প্রদান করা হয়।

এর মধ্যে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসিকে ২০২৪ সালের জুন মাসে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নগদকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ফলশ্রুতিতে সেই লাইসেন্স স্থগিত করা হলে প্রথম দফার এই উদ্যোগ বড় ধাক্কা খায় এবং কার্যত থমকে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন: বন্ধ শিল্পকারখানা সচলে ৪১ হাজার কোটি টাকা দেবে ১৭ ব্যাংক

পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা করা হয়। এরপর ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হলে মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান দরখাস্ত জমা দেয়।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে 'বিকাশ'-কে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নিয়ে বেশ বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ঠিক আগের মুহূর্তে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের জরুরি পর্ষদ সভা আহ্বানের উদ্যোগ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সভা স্থগিতের দাবি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ডিজিটাল ব্যাংকের এই আটকে থাকা কার্যক্রম পুনরায় সচল ও গতিশীল করার ঘোষণা দেন এবং দ্বিতীয় দফার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেন।

নতুন এই ডিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেমে শুধু দেশের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়িক গ্রুপই নয়, বরং মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, শীর্ষস্থানীয় টেলিকম অপারেটর, ক্ষুদ্রঋণ দানকারী সংস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নামী দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারাও জোরালোভাবে অংশ নিতে চাচ্ছেন। দ্বিতীয় দফায় আবেদনকারীদের তালিকায় রয়েছে রবি আজিয়াটার বুস্ট, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, আকিজ রিসোর্সের মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক, আশা এনজিওর মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক, আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২, ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের উদ্যোগ ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক এবং বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক। তবে নীতিগত গোপনীয়তার কারণে এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট কোন ৮টিকে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো. আরফান আলী এই উদ্যোগ সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়ে বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের যুগান্তকারী সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি তরুণ প্রজন্মকে খুব সহজেই আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করবে এবং সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে নতুন এই প্রতিযোগিতার কারণে প্রথাগত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল যুগোপযোগী করতে উৎসাহিত হবে।

তবে এর বিপরীত দিক তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই ব্যাংকগুলোর পথচলা পুরোপুরি মসৃণ হবে না। শক্তিশালী প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তরুণ গ্রাহকদের বড় ধরনের মেয়াদি আমানত না থাকায় শুরুর দিকে পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ করা বেশ কঠিন হতে পারে। তা ছাড়া তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাধারণ গ্রাহকদের ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতি এবং দেশের এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব হয়ে না ওঠা ডিজিটাল অবকাঠামো এই খাতের সামনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়