বিপৎসীমায় কাপ্তাই হ্রদের পানি, ডুবল ঝুলন্ত সেতু
ছবি: সংগৃহীত
টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতুটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে হ্রদের পানির উচ্চতা ১০৫ দশমিক ৬৪ ফুট মিন সি লেভেল (এমএসএল) রেকর্ড করা হয়, যা পরবর্তীতে বেড়ে ১০৫ দশমিক ০৯ থেকে প্রায় ১০৫ দশমিক ৬৪ ফুটের কাছাকাছি অবস্থান করে। উল্লেখ্য, কাপ্তাই হ্রদের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল এবং ১০৫ ফুট অতিক্রম করলেই তা বিপৎসীমা হিসেবে ধরা হয়।
পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুটির পাটাতন প্রথমে ৪ ইঞ্চি এবং পরবর্তীতে প্রায় ৬ ইঞ্চি পানির নিচে তলিয়ে যায়। সেতুটির বেশিরভাগ অংশ ডুবে যাওয়ায় পর্যটকদের পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন শনিবার দুপুর থেকেই সেতুটিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছে। পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানিয়েছেন, পানি কমে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে এবং পানি হ্রাসের পর সেতুটি সংস্কার করে পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
হ্রদের পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি কাচালং নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাঘাইছড়ি পৌরসভাসহ খেদারমারা, আমতলী ও সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। পৌরসভার বটতলী, এফ ব্লক, পুরাতন মারিশ্যা, মাস্টারপাড়া, মাদ্রাসাপাড়া, লাইল্যাঘোনা, উলুছড়ি, বাঘাইহাট, পশ্চিম মুসলিম ব্লক ও মধ্যমপাড়া এলাকার রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িতে পানি ওঠায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কিছু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ইতিমধ্যে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।
আরও পড়ুন: পানি বাড়ায় খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাই হ্রদের ১৬ গেট
এদিকে, অতিবর্ষণের ফলে বাঘাইছড়ির মারিশ্যা ইউনিয়নের ভূঁইয়াছড়া গ্রামে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইত্তুকমুয়া চাকমার বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আংশিক মাটির নিচে চাপা পড়ে। ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও মালামাল রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় গৃহবধূ কালাবী চাকমা ও তার ৭ বছরের শিশু কন্যা সুস্মিতা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এবং বর্তমানে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
হ্রদের অতিরিক্ত পানির চাপ কমাতে এবং উজান ও ভাটি এলাকার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার রাতে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হয়। রাত সোয়া আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে এই গেটগুলো খুলে দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, বর্তমানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট পূর্ণ সচল রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত করা হচ্ছে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, হ্রদের পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলের গতিপ্রকৃতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে গেট খোলার পরিমাণ বা সময়সীমা পরিবর্তন করা হতে পারে।
রাঙামাটির পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালাতেও ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব পড়েছে। দীঘিনালায় মাইনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মেরুং, কবাখালী ও বোয়ালখালীর নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে দীঘিনালা-মেরুং সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় লংগদুর সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু আমন খেত ও গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেরুং এলাকার পাবলাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে রাঙামাটিতে প্রায় ৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং এই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। কাপ্তাই হ্রদের পানি আরও বৃদ্ধি পেলে তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হ্রদ তীরবর্তী এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








