বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের
ফাইল ছবি
দীর্ঘ কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ফেডারেল আদালতের একটি যুগান্তকারী রায়ের পর গত ২১ আগস্ট থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, যা পরবর্তীতে ২৮ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হালনাগাদ করা ওয়েবসাইটেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রত্যাশী বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য পুনরায় ভিসা পাওয়ার পথ সুগম হলো।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা বা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবিধা প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। সে সময় মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর যেসব আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে দেশটির সরকারি সহায়তা বা কল্যাণমূলক সুবিধার (Public Benefits) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাদের বিষয়ে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। মার্কিন করদাতাদের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর কথা বলে এই নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
তবে এই নীতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করে ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক (CLINIC) এবং আফ্রিকান কমিউনিজ টুগেদার-এর মতো অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংগঠনগুলো। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে করা এই মামলায় নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল বিচারক জেনেট ভার্গাস ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক বা জাতীয়তার পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে অভিবাসী ভিসা আটকে রাখা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (Immigration and Nationality Act)-এর পরিপন্থী এবং তা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আইনি ক্ষমতার একচ্ছত্র সীমাকে অতিক্রম করেছে। বিচারক এই নীতিকে স্পষ্টভাবে বেআইনি বলে ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ের পর ২১ আগস্ট থেকে স্থগিতাদেশ কার্যকর না থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা নেই। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্ট করেছে যে, স্থগিতাদেশের এই সময়টাতে যেসব অভিবাসী ভিসা আগে থেকেই ইস্যু করা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করা হয়নি। এমনকি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নতুন আবেদন জমা দেওয়া এবং নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে (Interview) অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া চালু ছিল। মূলত ভিসা প্রক্রিয়ার একদম চূড়ান্ত ধাপে ভিসা প্রিন্ট ও স্টিকার বা ইস্যু করার ওপরই নিষেধাজ্ঞাটি বহাল ছিল।
আরও পড়ুন: ইরাককে ৮০ কোটি ডলারের হেলিকপ্টার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার অর্থ এই নয় যে আবেদনকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা বিনা শর্তে ভিসা পেয়ে যাবেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের স্বাভাবিক ভিসা-সংক্রান্ত সমস্ত আইনগত শর্ত, পুঙ্খানুপুঙ্খ ডকুমেন্টেশন, নিরাপত্তা যাচাই এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতা সফলভাবে প্রমাণ করতে হবে। এছাড়া সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার বিষয়টি প্রমাণে মার্কিন প্রশাসন সামগ্রিক স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া আরও কঠোর করতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মার্কিন দূতাবাসগুলোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ইন্টারভিউ সূচি ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি কিছু পরিবর্তন আসায় সাক্ষাৎকারের তারিখ পেতে কিছুটা সময় বা দীর্ঘসূত্রিতা হতে পারে।
বাংলাদেশ ছাড়াও এই আদেশের আওতাভুক্ত ৭৫টি দেশের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, মিয়ানমার (বার্মা), কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, কোত দিভোয়ার (আইভরি কোস্ট), কিউবা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডমিনিকা, মিশর, এরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, উত্তর ম্যাসেডোনিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান এবং ইয়েমেন।
উল্লেখ্য, এই নিষেধাজ্ঞার বাইরেও যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে এবং যারা এই ৭৫ তালিকার বাইরের কোনো দেশের বৈধ পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন, তারা আগে থেকেই এই বিধিমালার আওতামুক্ত ছিলেন। এছাড়া মার্কিন নাগরিকদের মাধ্যমে দত্তক নেওয়া শিশু এবং কিছু বিশেষ জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রগুলো এই প্রোক্লেমেশনের বাইরে রাখা হয়েছিল। তবে পর্যটক, শিক্ষার্থী কিংবা সাময়িক কর্মীরা যে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার মাধ্যমে যাতায়াত করেন, তা এই অভিবাসী ভিসার নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সার্বিক এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








